সুন্দরবনে শিকারিদের উত্পাত

বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনা ভাইরাসে লকডাউনের কারণে প্রকৃতি তাহার স্বরূপ ফিরিয়া পাইতেছে। বিভিন্ন পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো এখন জনশূন্য। সমুদ্র ও নৌপথেও পণ্য পরিবহন কার্যত বন্ধ। ইহাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ লোকালয়েও পশুপাখিরা আনন্দে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। বঙ্গোপসাগরের অনেক স্থানে ডলফিনগুলি নাচানাচি করিতেছে মনের আনন্দে। কুয়াকাটা সৈকত-লাগোয়া জলে নির্বিঘ্নে সাঁতার কাটিতেছে মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে। অনুরূপভাবে সুন্দরবনে অবাধে বিচরণ করিতেছে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেখা দিয়াছে বিপত্তি। করোনার কারণে গত ১৯ মার্চ হইতে সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবং আগের তুলনায় বনরক্ষীদের নজরদারি কমিয়া যাওয়ায় চোরা শিকারিরা এখানে সক্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। এই চক্রের সদস্যরা গোপনে বা ছদ্মবেশে বনের সংরক্ষিত অভয়ারণ্য এলাকায় অনুপ্রবেশ করিয়া ফাঁদ পাতিয়া হরিণ শিকার করিতেছে। কখনো জীবিত হরিণ পাচার করিয়া দিতেছে সংগোপনে। করোনায় সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারির পর এই পর্যন্ত অর্ধশত হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটিয়াছে, যাহা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

করোনা দুর্যোগকালে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাটা চ্যালেঞ্জ হইয়া পড়িয়াছে। এই সময় সুন্দরবনে পর্যটকের আনাগোনা না থাকায় চারিদিকে বিরাজ করিতেছে সুনসান নীরবতা। চোরাকারবারিদের জন্য ইহাই মোক্ষম সময়। এই জন্য এই দুর্যোগকালে সুন্দরবনের নিরাপত্তা কার্যক্রম যেইখানে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, সেইখানে কমাইয়া দেওয়া বা বনরক্ষীদের ঢিমেতালে দায়িত্ব পালন করা মোটেও কাম্য নহে। জানা যায়, সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর হইতে ১২ মে পর্যন্ত বন বিভাগ, পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের অভিযানে ১০০ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হইয়াছে। জব্দ করা হইয়াছে ১ হাজার ৯৫০ ফুট ফাঁদ, কয়েকটি নৌকা ও ট্রলার। হরিণ শিকারের অপরাধে গ্রেফতার করা হইয়াছে ছয় জনকে। বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারের অভিযোগ, এই পর্যন্ত অভিযান পরিচালনাসহ যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হইয়াছে তাহা অত্যন্ত অপ্রতুল। তাহা ছাড়া শুধু হরিণের মাংস জব্দ করিলে চলিবে না, হরিণ রক্ষায় সুন্দরবনে চোরাকারবারিদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করিতে হইবে। এইখানকার প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় দিনরাত্রি ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তারব্যবস্থা করিতে হইবে। বৃদ্ধি করিতে হইবে টহল ও নজরদারি।

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় বন। জাতীয় পশু বাঘ এই বনেরই নিবাসী। বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান হিসাবেও এই বন আমাদের নিকট গর্বের ধন। ইহা আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এবং নানা জীবজন্তু, পাখি ও উদ্ভিদসহ জীববৈচিত্র্যের সুরম্য নিকেতন হিসাবে সমুদ্রের কোল ঘেঁষিয়া অটল দুর্গের মতো দাঁড়াইয়া আছে। মা যেমন সকল বিপদ-আপদ হইতে সন্তানকে রক্ষা করে, তেমনি ঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসপীড়িত দক্ষিণাঞ্চলকে সুরক্ষা দান করিতেছে সুন্দরবন। ইহা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের আবহাওয়ার আর্দ্রতা রক্ষা করে, কুয়াশা হ্রাস করে এবং বৃষ্টিপাতে সাহায্য করে। তাই সুন্দরবন রক্ষা করা মানে বাংলাদেশকে রক্ষা করিবারই নামান্তর। এই জন্য এই বনের যে কোনো নেতিবাচক সংবাদে আমরা বিচলিত না হইয়া পারি না। আশা করি, এই করোনাকালে সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হইবে। চোরাকারবারিদের গ্রেফতার করিয়া সোপর্দ করিতে হইবে আইনের হস্তে।