সানিয়া আক্তার
বিশ্ব এখন করোনা নামক এক শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। করোনার ব্যাপক বিস্তৃতি ও প্রাণহানী রাষ্ট্রগুলোর জাতীয়তাবাদী ও কর্তৃত্ববাদী চরিত্রকে প্রকাশ করে দিচ্ছে। তারা নিজেদের রক্ষা করতে কেবলমাত্র নিজেদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশগুলো সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। আমদানি ও রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে অনেক দেশ। এছাড়াও চলছে দোষারোপের সংস্কৃতি। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র করোনা ভাইরাস জন্মদানের জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করছে। মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প কোভিড-১৯ কে ‘চীনা ভাইরাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়ানোর ক্ষেত্রে ইরানকেও দায়ী করেছে। এছাড়াও, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ‘চীনঘেঁষা’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার তথ্য গোপন করার অজুহাত দেখিয়ে সংস্থাটিকে তহবিল প্রদান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একক বৃহত্তম দাতা দেশ। গত বছর সংস্থাটিকে ৪০ কোটি ডলার দিয়েছিল তারা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মোট বাজেটের ১৫ শতাংশের একটু কম। মহামারির এই সময়ে এ ধরনের পদক্ষেপ হতাশাজনক। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থার কাছে করোনা মোকাবিলায় যে আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়েছিল তার এক-চতুর্থাংশও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে করোনা মহামারি মোকাবিলায় জাতিসংঘের যেসব কর্মসূচি রয়েছে তাও পড়েছে ঝুঁকির মুখে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি মন্দার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য হ্রাসের কারণে অর্থনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে আছে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব বাড়ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বড়ো অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে উন্নত বিশ্ব এ সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হলেও উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত বিশ্বের এ সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হবে। এর ফলে উন্নত এবং অনুন্নত বিশ্বের ব্যবধান আরো বেড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। আমাদের মতো দেশে করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে এবং সংকট থেকে বাঁচতে ব্যাপক আকারে কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত করতে হবে। এজন্যে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য স্বল্প সুদে ঋণদানের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি দিতে হবে। উন্নত দেশগুলোকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংকসহ সকল আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণদানের জন্য তাদের শর্তগুলো শিথিল করতে হবে।
তবে শুধু অর্থনৈতিক সংকটের দিকে দৃষ্টি নিমজ্জিত না রেখে করোনায় সৃষ্ট মানবিক সংকট মোকাবিলাতেও বিশ্বের সকল দেশকে একত্রে কাজ করতে এগিয়ে আসা উচিত। এজন্যে সামাজিক সংগঠনগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে আসার এবং মানবিক সংকট মোকাবিলায় কোঅপারেটিভ ও কালেক্টিভ সকল এনটিটিকে কাজে লাগাতে হবে। চটজলদি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদের কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া এক্ষেত্রে উত্তম হবে। এই মুহূর্তে যা দরকারি তা হচ্ছে, ভ্যাকসিন ও প্রতিষেধক তৈরি এবং উত্পাদনে সকল দেশের সহযোগিতা। জনস্বাস্থ্য খাতে সময় এসেছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার।
এখন কালচারালি কিংবা এথনিকালি ন্যাশনালিজম নিয়ে গর্ব করার সময় নয়, বরঞ্চ এখন নিজের দেশকে বুকে লালন করে বৈশ্বিক একাত্মতায় নিজেকে ভাবা যেতে পারে। দোষারোপের রাজনীতির বদলে মানবিক সামাজিকায়নের দিকে যাওয়া প্রয়োজন।
করোনা এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে কোনো একক দেশের পক্ষে একাকি সবকিছু সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। এই দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর ভবিষ্যতে এর চেয়েও মারাত্মক কোনো ভাইরাস যে দুনিয়ায় দেখা দেবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আলাদা আলাদাভাবে চেষ্টা করে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না। দ্রুত এই বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে সবাইকে পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘কোভিড-১৯ নাটকীয়ভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, হয় আমরা একত্র হব অথবা আমরা হেরে যাব।’
লেখক: শিক্ষক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউট অব লিবারেশন ওয়্যার অ্যান্ড বাংলাদেশ স্টাডিজ।