মৌসুমি ফল বাজারজাত করা না গেলে চাষিরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন

করোনা সংকটে আম, লিচুসহ অন্যান্য মৌসুমি ফল চাষিদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে বাজারজাতসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে বলেছেন সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা।

তারা বলেছেন, করোনার কারণে সাধারণ মানুষের আয় কমে যাওয়ায় বাজারে কৃষিপণ্যের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া পণ্য পরিবহন শেষে ট্রাক খালি ফেরার আশঙ্কায় ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে খেতেই উত্পাদিত বেশির ভাগ ফল ও সবজি নষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের বিপণন এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। তারা ট্রাকের জ্বালানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ব্যারাক, হাসপাতাল, জেলখানাসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে কৃষকের কাছ থেকে আম কিনে সরবরাহ করা, মধু মাসে বিদেশি ফলের আমদানি কমানোর পদক্ষেপ নেওয়াসহ একগুচ্ছ সুপারিশ করেছেন।

গতকাল শনিবার কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আম, লিচুসহ মৌসুমি ফল এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ নিয়ে অনলাইনে (জুম প্ল্যাটফরমে) মতবিনিময়কালে তারা এসব সুপারিশ করেন। সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে এ অনলাইন মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়।

সভায় কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, খাদ্য মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহ্?মুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহ?রিয়ার আলম, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনা?ইদ আহ?মেদ পলক, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. আ ফ ম রুহুল হক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, চাঁপাই নবাবগঞ্জের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহম্মেদ শিমুল, কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ এবং জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি রবার্ট সিম্পসন অনলাইনে সংযুক্ত ছিলেন। সভাটি সঞ্চালনা করেন কৃষিসচিব মো. নাসিরুজ্জামান।

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, করোনার প্রভাবে মৌসুমি ফলসহ কৃষিপণ্যের পরিবহন এবং বাজারজাতকরণে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃষকেরা তাদের উত্পাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারছে না। করোনার কারণে তরমুজ চাষিরা উত্পাদিত তরমুজের অধিকাংশই বিক্রি করতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আম, লিচু, আনারস, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল বাজারে আসতে শুরু করেছে। এসব মৌসুমি ফল সঠিকভাবে বাজারজাত না করা গেলে চাষিরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি সাধারণ মানুষের আয় কমে যাওয়ায় কৃষিপণ্যের চাহিদা হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহনের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। ট্রাকের জ্বালানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে যাতে ট্রাকের ভাড়া কম হয়। তিনি পুলিশ ব্যারাক, সেনাবাহিনীর ব্যারাক, হাসপাতাল, জেলখানাসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে কৃষকের কাছ থেকে আম কিনে সরবরাহ করার সুপারিশ করেন।

খাদ্য মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ব্যবসায়ী, আড়তদারদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে পরিচয়পত্র ইস্যু এবং ব্যাংকের লেনদেনের সময়সীমা বাড়াতে হবে। এছাড়া চাষিদের বাঁচাতে মধু মাসে বিদেশি ফলের আমদানি কমানোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব রাখেন।

করোনার সময়ে সকল ধরনের কার্গো লঞ্চ চালু আছে জানিয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহ?মুদ চৌধুরী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করে আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে হবে, না হলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহ?রিয়ার আলম বলেন, গত কয়েক বছরে আমের ভালো দাম না পাওয়ায় রাজশাহীতে আম চাষ কমে যাচ্ছে। তিনি আমে ফরমালিন বা ক্ষতিকর কিছু নেই মর্মে জনগণকে সচেতন ও আশ্বস্ত করতে ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে সকল গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর পরামর্শ দেন।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ?মেদ পলক বলেন, আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে প্রযুক্তি নির্ভর ‘এক শপ’ অ্যাপস চালু করা হবে যার মাধ্যমে সারাদেশের চাষিরা পণ্য বেচাকেনা করতে পারবে। এর মাধ্যমে চাষিদের পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

ড. আতিউর রহমান বলেন, কৃষি খাতে অতিরিক্ত বাজেটের প্রয়োজন হলে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদের সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, এই সংকটের সময় তারা পাশে থেকে কাজ করবে। আম-লিচু পরিবহনের কোনো সংকট হবে না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

সভায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর ও সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ছাড়াও দেশের শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানিকারক সমিতি, সুপারশপ মালিক সমিতি, আম-লিচু চাষি, ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা সংযুক্ত ছিলেন।