আহসান হাবিব লিমন
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে এই মারাত্মক কোভিড-১৯-এর ছোবলে। ক্ষতির সম্ভাব্য পরিমাণটা সরকারি কোনো হিসেবে না মিললেও, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের একদল গবেষক তাদের গবেষণায় বলেছেন, ‘কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে গড়ে মোট অনুমিত ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং তা ক্রমবর্ধমান বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে পুরো মে মাস লকডাউন থাকলে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে’।
সর্বপরি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে লকডাউনে গত কয়েক মাসেই।
এর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ৩.০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার’।
এমতাবস্থায় দেশে এখন শিল্প উত্পাদন নেই, নেই কোম্পানির আয়, ব্যাংকগুলো ঋণের কিস্তি স্থগিত হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাতে চলছে চরম অর্থনৈতিক মন্দা। জীবিকার প্রয়োজনে দেশের মানুষের জীবন ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। ছোটো, বড়ো, মাঝারিসহ সকল ধরনের শিল্প উত্পাদন খাত তাকিয়ে আছে শুধু সরকারি প্রণোদনার দিকে। সরকারি সাহায্য ছাড়া এখন আর কোনো উপায় দেখছে না দেশের সাধারণ মানুষ।
এর মধ্যে এ আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার এরই মধ্যে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে। ৪ কোটি মানুষকে দেওয়া হয়েছে খাদ্যসহায়তা। ছোটো, বড়ো সকল উত্পাদন ও সেবা খাতই সরকারি প্রণোদনার আওতায় আসছে।
করোনার প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে এ বরাদ্দও বাড়াতে হবে। তাই দেশ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থের অথচ সরকারের আয়ের খাত হচ্ছে সীমিত।
দেশের প্রধান আয়ের উত্স হচ্ছে রাজস্ব খাত। করোনার সংকট মোকাবিলায় অর্থ মন্ত্রণালয় এ বছর রাজস্ব আদায়ের হিসেব করছে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা যা স্বাভাবিক কোনো সময়েই পূরণ করা সম্ভবপর নয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কে লক্ষ্য অর্জনে গতবারের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে কিন্তু ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
সহজেই অনুমেয় যে, বড়ো ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়তে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
অথচ মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে এনবিআর ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আদায় করতে পেরেছে মাত্র ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাত্ ইতিমধ্যেই ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি তার ফেসবুকে জানান, ‘১৭ কোটি মানুষের দেশে ২ শতাংশ মানুষও ঠিক মতো তার আয়কর পরিশোধ করে না’।
তাহলে সরকার একা কীভাবে এ ধসে যাওয়া অর্থনীতিকে বাঁচাবে? তাই ঈদকে সামনে রেখে সীমিত আকারে শপিংমল, গার্মেন্টস, কলকারখানা প্রতিষ্ঠান খোলা নিশ্চয় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নয়।
হতে পারে দেশের এ রাজস্ব সংকটকে কেন্দ্র করে করোনা পরবর্তী সময়ে উচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্সের ভিড়ে সৃষ্টি হবে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি সঙ্গে বাড়তে থাকবে মুদ্রাস্ফীতির হার। এইসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকুক আপনিও কারণ এ দেশে প্রতিটা দুরবস্থাকে কেন্দ্র করে স্বার্থ হাসিলে জেগে উঠে কোনো এক বিশেষ শ্রেণি। তখন হয়তো বাধ্য হয়ে সরকারকে বড়ো বড়ো বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্যের জন্য হাত পাততে হবে বিশ্বের দরবারে।
লেখক :শিক্ষার্থী. সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়