হাসান ইমাম
লকডাউন বিশ্বব্যাপীই মোটা দাগে দুই কিসিমের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে— একটি পেটের, অন্যটি পরানের। দুটোই ‘উত্তপ্ত’। এই তাপিত অবস্থার একটি বিরক্তিকর, অন্যটি অসহনীয়। অলঙ্ঘনীয় কি? সিনেমা দেখে, বই পড়ে, নতুন নতুন রেসিপি ট্রাই করে, ভিডিও চ্যাট করে যারা আর সময় কাটাতে পারছেন না, তারা লকডাউনে ত্যক্তবিরক্ত, বোরড। উফ, আর কাঁহাতক! ক্ষুধার আগুন তারা চেনেন না। পেটের চিন্তাহীন এই মানুষদের পরান হাঁসফাঁস, মাথা ‘গরম’। এভাবে ঘরবন্দি বেশি দিন থাকলে হয়তো পাগলই হয়ে যাবেন। স্বাভাবিক ছন্দে আগের দিনপঞ্জিতে ফিরতে তারা অস্থির।
যাদের পেটে টান পড়েছে, তারাও ‘অস্থির’। এক দণ্ড স্থিরতা দিচ্ছে না তাদের ক্ষুধার আগুন। জীবনের ছন্দের কথা তাদের আজন্ম অজানা। যাদের নিয়ে কবির উপলব্ধি— ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। কে না জানে, ক্ষুধার আগুন ব্যক্তিমানুষকে শুধু পেটে পোড়ায় না, গোটা বিশ্বটাকেই ‘জাজ্বিল্যমান চুলা’র ভ্রম তৈরি করে। এই পেটপোড়ানি মানুষদেরও আর দিন কাটছে না লকডাউনে। ক্ষুধায় তারা পাগলপ্রায়। আর তাই খাবারের সন্ধানে তারা ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়ছেন ইতস্তত, যা অনেকের চোখেই অকারণ ঘোরাফেরা।
গণমাধ্যমসহ জরুরি সেবায় যুক্ত অনেকেই হররোজ দেখছি, এমনকি মাঝরাতেও রাজধানীর রাজপথের পাশে একটু সাহায্য পাওয়ার আশায় হাত বাড়িয়ে বসে আছেন অসহায় নারী, বয়োবৃদ্ধ, কর্মহীন মানুষ। মহামারির ‘আসল’ ছাপ পড়েছে জীবনে। দরকার একবার তাদের দিকে চোখ খুলে তাকানো। সংক্রমণের সংখ্যা আর মৃত্যুহার দিয়ে এই ভয়াবহতা বোঝানো যাবে না। উন্নত, উন্নয়নশীল ও গরিব— মোটা দাগে এই তিন ক্যাটাগরির দেশগুলোর মধ্যে শেষের দুটিতে লকডাউন ভেঙে রাস্তাঘাটে মানুষের আনাগোনা তাই দিন দিন বাড়ছে। এই হিসাব অবশ্য যতটা সহজ মনে হচ্ছে, অঙ্কটা ঠিক ততটাই জটিল। স্বাভাবিক সময়ে শ্রমের বিনিময়ে যেসব মানুষের তিন বেলার খাবারও ভর্তি থালায় জোটে না; তাদের সঞ্চয়ের ভাঁড়ার শূন্য থাকাই দস্তুর। এক দিন কাজ বন্ধ তো পরের দিন চুলায় আগুন জ্বলবে না তাদের। কিন্তু পেটের আগুনের তো বিরাম নেই। সুতরাং ঘরে বসে থাকা মানে তাদের উপোস থাকা। আর ঘরেই-বা থাকবেন কী; ‘ঘর’ও তাদের চুলাসম! একরত্তি জায়গায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে গাদাগাদি করে বাস। পানীয় জল, পয়োনিষ্কাশন ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা অনুপস্থিত। মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা তারা শুনেছেন কি না সন্দেহ; ভোগ করা তো দূর কি বাত।
ছোটোখাটো নানা ধরনের কাজকর্মে মোটামুটি যারা অনটনহীন, তাদের পক্ষেও এক-দুই মাস টানা বসে খাওয়া অসম্ভব। এই শ্রেণিভুক্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকানি, হকার, ফেরিওয়ালা, পরিবহন, নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, সিএনজি চালক, সবজি বিক্রেতা, দোকানের কর্মচারী, হোটেলের বাবুর্চি-কর্মচারী, ঝি-বুয়া, দরজি, নরসুন্দররা হাত পাততেও পারছেন না। কিন্তু পেটে তাদেরও একই আগুন। রাষ্ট্রের এ কথা অজানা নয়। আবার রাষ্ট্র এ-ও ওয়াকিবহাল, গোটা বিশ্বই আজ এমন সংকটে পতিত, যেখানে জীবন ও জীবিকা সমান্তরালে টেনে নেওয়া কঠিন। এই কঠিন কাজটি আরো কঠিন করে তোলে অব্যবস্থাপনা।
সুতরাং ক্ষুধার গদ্যময়তা আরো ব্যাপ্ত করতে রাষ্ট্রের রাজকোষের আকার-আয়তন যতটা না, তার চেয়ে বেশি দায়ী দুর্নীতি। যে দেশে মহামারির এই সময়েও ত্রাণ নয়ছয়ের ধুম পড়ে, সে দেশে গরিবের বাঁচার পথ থাকে না। ত্রাণ চুরির অভিযোগে এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হয়েছেন। তাহলে কি ক্ষুধায় মরে যাওয়াই এসব ম্লান মানুষের নিয়তি? এরই মধ্যে ১ কোটির বেশি পরিবারের পৌনে ৫ কোটি মানুষকে সরকারিভাবে ত্রাণসহায়তা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগেও জারি আছে প্রচেষ্টা।
এমনিতেই বিশ্বব্যাপী ফি বছর ৯০ লাখ মানুষ ক্ষুধা ও ক্ষুধাজনিত রোগব্যাধিতে ভুগে প্রাণ হারায়। করোনার কারণে এরই মধ্যে ৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষ নীরব ক্ষুধার শিকার হয়েছে। ক্রমবর্ধমান খাদ্যসংকটে ২৬টি দেশের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক জরিপ অনুযায়ী, দেশের গরিব মানুষের আয় ৭০ শতাংশ নেমে গেছে। অর্থাত্ সংকট করোনার, কিন্তু মানুষ মরবে না খেয়ে। কী দারুণ ব্যবস্থা! ব্যবস্থাই গরিব মারার ইন্তেজাম পাক্কা করে রেখেছে। প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো সংকটে সেই ব্যবস্থা ‘গণমৃত্যু’ ঘটাবে মাত্র। ভবিষ্যত্ দেখা যায় না ঠিকই, কিন্তু সঠিক কর্মপরিকল্পনা দিয়ে ভবিষ্যত্ নিজেদের মতো করে সাজানো যায়। ক্ষুধায় মৃত্যু তাই অলঙ্ঘনীয় নয়।
লেখক : সাংবাদিক
hello.hasanimam@gmail.com