পাখিই একমাত্র জীব যা সরাসরি মানুষের উপকার করে থাকে। পাখির ডাক শুনতে না পেলে একটা ভোর কখনো স্নিগ্ধ হয় না। অথচ সেই পাখির খাবার নিয়ে আমরা কখনো চিন্তা করি না!
পাখি পাকা ফল খাওয়ার সময় বীজসহ খায়, পরে বিষ্ঠার সঙ্গে বীজ বের হয়ে যায়, সেখান থেকে জন্ম নেয় নতুন গাছ। সবুজায়নে পাখির অবদান মুগ্ধকর। বাড়ির ভিটেমাটি, জঙ্গলময় স্থানে চোখে পড়ে নতুন অনেক গাছ, যেগুলো কারো লাগানো নয়। ফুলের পরাগায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পাখি। তবে সবচেয়ে গুরুত্ববহ কাজ হলো কীটপতঙ্গ নিধন। ফসলের অসংখ্য ক্ষতিকারক পোকা পাখি খেয়ে ফেলে। ফলে ফসল প্রাকৃতিকভাবে রক্ষা পায়। শূন্যে উড়ে উড়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে পাখি উড়ন্ত পোকা খায়। পরিসংখ্যান বলে, ছোটো একটি পাখি ১ ঘণ্টায় ১২০০ পোকা খেয়ে ফেলতে পারে।
চীন দেশের বহুল আলোচিত একটি ঘটনা। ষাটের দশকে চীনা গবেষকদের প্রতিবেদনে উঠে আসে, একটি চড়ুই পাখি বছরে ৪ থেকে ৫ কেজি শস্য খেতে পারে; সে হিসেবে দশ লাখ চড়ুইয়ের খাবার বাঁচিয়ে প্রায় ৬০ হাজার ব্যক্তির খাদ্যের যোগান দেওয়া যেতে পারে। উচ্চমহলকে ভাবনায় ফেলে দিল। কৃষির আশু ক্ষতির কথা ভেবে ১৯৫৮ সালে মাও-সে-তুংয়ের নির্দেশে অসংখ্য চড়ুই নিধন করা হয়। জোরেশোরে প্রচারণা চালানো হলো। রাতারাতি তৈরি হলো এক লাখ রঙিন পতাকা। চড়ুই মারার উত্সবে মেতে উঠল গোটা চীন দেশ। ‘স্প্যারো আর্মি’ কাজে লেগে গেল। ইতিহাসের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্যে পুরস্কারও ঘোষণা করা হলো। বিভিন্ন পদ্ধতিতে চড়ুই নিধন হতে লাগল। যেমন দীর্ঘ সময় ধরে খুব জোরে জোরে ড্রাম বাজাতেই চড়ুই উড়ে উড়ে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়তে লাগল। ডিম ও বাসা নষ্ট করা হলো। জালে আটকা পড়ল অসংখ্য চড়ুই। বন্দুক দিয়ে গুলি করে মারা হলো বাকি চড়ুইপাখি। চড়ুইশূন্য হলো চীন। পরের বছরগুলোতে ফসলে স্বাধীনভাবে হানা দিল ক্ষতিকর অজস্র পোকা। পরিস্থিতি এমন হলো, সেই ফসল আর ঘরে তোলা গেল না—যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে ১৯৬১-৬২ সালে চীনে দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। মারা গেল ২০-৩০ মিলিয়ন মানুষ। টনক নড়ল দেশটির সরকারের। প্রকৃতিতে চড়ুই ফিরিয়ে আনতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু হলো চড়ুই আমদানি।
পরিবেশ রক্ষায় মানুষের চেয়ে পাখির ভূমিকা বেশি। পাখি আমাদের পরম বন্ধু। আমাদের চারপাশে রয়েছে নানান ফলদ গাছ। ফল পাখির ভালো খাবার। অসংখ্য ফলগাছ পাখির ফেলে যাওয়া বীজ থেকে হয়েছে। সুতরাং গাছের ফলে রয়েছে পাখিরও অধিকার। পাখির জন্যে গাছে কিছু ফল রাখা উচিত। তাহলে পাখি এইসব ফল খেয়ে আবার সেই গাছের বিস্তার ঘটাবে, উপকার হবে মানুষের-ই।