দেশে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ক্রমশ ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। ১০ সপ্তাহের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহেই আগের সপ্তাহের চেয়ে আরো বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠছে এ ভাইরাস। এক দিনেই রেকর্ড ২১ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৪৯ জন। গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯ হাজার ৭৮৮টি নমুনা পরীক্ষা করে আরো ১ হাজার ৬০২ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ায় দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৮৭০ জন। গত ১০ সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা এটাই সর্বোচ্চ।
এদিকে দেশে করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কারফিউ জারির দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যেসব দেশ স্বাস্থ্যবিধি মেনেছে তারা সফল হয়েছে। যেহেতু এই রোগের কোনো ওষুধ নেই, তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। মানুষের চলাচল যত বাড়বে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি ততই বেশি হবে বলে আগেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের অনেক মানুষ লকডাউন ঠিকঠাক না মানার ফলে পরিস্থিতি ভয়ংকর আকার ধারণ করছে বলে আশঙ্কা তাদের।
তবে তারা এ-ও বলছেন, সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর প্রথম দিকে লোকজন সরকারের নির্দেশনাগুলো মোটামুটি পরিপালন করেছে। কিন্তু তৈরি পোশাক কারখানা এবং ঈদ উপলক্ষ্যে সীমিত আকারে দোকানপাট ও শপিংমল খুলে দেওয়া হয়েছে। কিছু শর্তের ভিত্তিতে মসজিদও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে শিথিলতার শুরুতেই শনাক্তের সংখ্যা ও মৃত্যু বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) চেয়ারম্যান ও করোনা মোকাবিলায় জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, করোনা ভাইরাস এখন ঊর্ধ্বমুখী। এটা কোথায় গিয়ে ঠেকবে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য যেসব দেশের মানুষ লকডাউন মেনেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছে তারা সফল হয়েছে। আর যারা মানেনি তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের দেশে সরকার লকডাউন ঘোষণা করলে জনগণ তা মানে না। দেশবাসীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি উপসর্গবিহীন করোনা আক্রান্ত রোগী। তারা সব জায়গায় গিয়ে অন্য মানুষকে সংক্রমিত করছে। সুস্থ থাকায় সে যে আক্রান্ত এটা কেউ বুঝতে পারছে না। তাই উপসর্গ থাকুক আর না থাকুক সবারই ঘরে থাকতে হবে। নইলে ঝুঁকি বাড়বে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, লকডাউন প্রথমে দেশের মানুষ মেনেছিল। এ কারণে আমরা ভালো ছিলাম। লকডাউন শিথিল করায় জনগণ বাইরে বের হচ্ছে, হাটবাজারে মানুষের ভিড়—এতে ঝুঁকি বাড়ছে। করোনা আক্রান্ত রোগী মারা গেলে তার কাছে স্বজনরা যান না। অথচ হাটবাজারে কেনাকাটা করতে তারা ভিড় করছেন। তাই এখন বাঁচতে হলে কারফিউ দিতে হবে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।
বিশিষ্ট এপিডিমিওলজিস্ট অধ্যাপক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, সামাজিক দূরত্ব মানতেই হবে। করোনা ভাইরাসের জন্য এটিই এখন একমাত্র ওষুধ। কী কী করলে কমবে এবং কী করলে বাড়বে সেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
গতকাল নিয়মিত বুলেটিনে যুক্ত হয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, সারাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ২১২ জন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৫৮৫ জন সুস্থ হয়ে উঠলেন। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ, মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
ঢাকার ১৮৬ স্থানে করোনা রোগী
যত দিন যাচ্ছে রাজধানীর করোনা পরিস্থিতি ততই ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। ঢাকার সর্বত্রই এখন ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। দেশে মোট আক্রান্তের মধ্যে ৫৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ রোগীই রাজধানীর। গতকাল পর্যন্ত রাজধানীর ১৮৬টি স্থানে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে পাঁচটি এলাকায় ২ শতাধিক রোগী রয়েছেন। যার মধ্যে কাকরাইলে সর্বোচ্চ ২৯৮ জন রোগী রয়েছেন। এর পাশাপাশি যাত্রাবাড়ীতে ২৪২ জন, মহাখালীতে ২৩৫ জন, মোহাম্মদপুরে ২১৩ জন ও রাজারবাগে ২০৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। আর আটটি এলাকায় শতাধিক রোগী পাওয়া গেছে। যার মধ্যে মুগদায় ১৯৮ জন, তেজগাঁওয়ে ১৫০ জন, মগবাজারে ১২৫ জন, লালবাগে ১২২ জন, বাবুবাজারে ১১৭ জন, মালিবাগে ১১৪ জন, উত্তরায় ১১১ জন ও ধানমন্ডিতে ১০৬ জন করে রোগী রয়েছেন। অর্ধশতাধিক করে রোগী রয়েছে ১৮টি এলাকায়। যার মধ্যে আগারগাঁওয়ে ৭৮ জন, বাড্ডায় ৯৭ জন, বনানীতে ৫৮ জন, বংশালে ৮৪ জন, বাসাবোয় ৬৫ জন, চকবাজারে ৭০ জন, গেন্ডারিয়ায় ৭৭ জন, গুলশানে ৬৮ জন, হাজারীবাগে ৬৫ জন, খিলগাঁওয়ে ৮৬ জন, মিরপুরে ৮৩ জন, মিরপুর-১-এ ৫৮ জন, রামপুরায় ৬০ জন, রমনায় ৫০ জন, শাহবাগে ৭৩ জন, শ্যামলীতে ৭০ জন, স্বামীবাগে ৫০ জন ও ওয়ারিতে ৭১ জন।
অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ১৯৬টি। নতুন যারা মারা গেছেন, তাদের ১৭ জন পুরুষ, চার জন নারী। দুই জন ত্রিশোর্ধ্ব, ছয় জন চল্লিশোর্ধ্ব, আট জন পঞ্চাশোর্ধ্ব এবং পাঁচ জন ষাটোর্ধ্ব। এদের মধ্যে হাসপাতালে আনার পর মৃত ঘোষণা করা হয় দুই জনকে, হাসপাতালে মারা যান ১৫ জন এবং বাসায় মারা যান চার জন। এদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের ১২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের সাত জন, সিলেট বিভাগের এক জন এবং রাজশাহী বিভাগের এক জন রয়েছেন। ঢাকা বিভাগের মধ্যে রাজধানীর ছয় জন, ঢাকা জেলার দুই জন, গোপালগঞ্জের এক জন, মুন্সীগঞ্জের এক জন, টাঙ্গাইলের এক জন, মানিকগঞ্জের এক জন রয়েছেন। আর চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে জেলায় তিন জন, ফেনীর দুই জন, নোয়াখালীর এক জন ও কুমিল্লার এক জন রয়েছেন। এছাড়া অন্য দুই বিভাগের মধ্যে সিলেটের এক জন এবং বগুড়ার এক জন রয়েছেন।