নির্বাচন কমিশন (ইসি) রিটার্নিং অফিসারদের (জেলা প্রশাসক) সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ আর পেছানোর সুযোগ নেই। এ ছাড়া এ নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে আপিল করলেও তার মনোনয়নপত্র বাতিল করতে হবে। এরপর ওই প্রার্থী রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করলে কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এ নির্বাচনে জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা স্বপদে থেকে প্রার্থী হতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন দেখে আপাতত রিটার্নিং অফিসারদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফিং অনুষ্ঠানে কমিশনের পক্ষ থেকে এ সব কথা বলা হয়। ইসি আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ইসি কার্যালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদাসহ অন্য কমিশনারবৃন্দ বক্তব্য দিলেও দ্বিতীয়ার্ধে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন কমিশনার মোঃ রফিকুল ইসলাম।
এ দিকে রাজনৈতিক দলের দলীয় কার্যালয় থেকে দলের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার সময় মিছিল, শো-ডাউন এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুুলিশের আইজিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে চিঠি দিয়েছে কমিশন। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের জন্য ব্রিফিং অনুষ্ঠানের কারণে আজ দুপর ১২টায় নির্বাচন কমিশন সময় দিতে পারবে না। বৈঠক হতে পারে বিকাল সাড়ে ৩টায়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে না। রিটার্নিং অফিসারদের এক ব্রিফিংয়ে ইসি জানিয়েছে, এবার সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে কমিশন। তাই সকল প্রকার পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে রিটার্নিং অফিসারদের কাজ করার নির্দেশনাও দেয়া হয় ব্রিফিংয়ে।
ব্রিফিংয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেন, নির্বাচন আর পেছানোর সুযোগ নেই। ৩০ ডিসেম্বরও যথেষ্ট সময় নয়, অত্যন্ত ‘কমপ্যাক্ট টাইম’। নির্বাচন আর পেছানোর সুযোগ না থাকার পেছনে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এতো বড় একটি নির্বাচনের পর ২৯ জানুয়ারিতেই সংসদ বসতে হবে। ৩০০ আসনের ফলাফলের গেজেট করার জন্য সময় লাগে। এ ছাড়া বিশ্ব ইজতেমা হবে ১১ জানুয়ারি। এ সময় সারাদেশ থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সেখানে আনতে হয়। সিইসি বলেন, নির্বাচনের জন্য ৩০ তারিখও (৩০ ডিসেম্বর) যথেষ্ট সময় নয়, আরও সময় নেয়া দরকার ছিল। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারিনি। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বড়দিনসহ বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে ২৩ তারিখ নির্বাচনের বিষয়টি পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু যেহেতু নির্বাচনে সবদল অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। আমরা খুশি হয়েছি। সময় কিছুটা পেছানো হয়েছে। তবে ভোটের তারিখ আর পেছানোর সুযোগ নেই।
এবার নতুন প্রেক্ষাপটে ভোট হচ্ছে উল্লেখ করে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, এ বছর নির্বাচনের পরিবেশ হবে ভিন্ন। এর আগে দেশে কখনো রাষ্ট্রপতি শাসিত নির্বাচন, কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, কখনো সেনাবাহিনীর অধীনে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচন সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ সংসদ রেখে, সরকার রেখে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৪ সালে এমন একটি নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্বাচনে সব দল অংশ নেয়নি। এবারের নির্বাচনে সব দল অংশ নিতে যাচ্ছে। সংসদ ও সরকার বহাল রেখে নির্বাচন হওয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অনেকগুণ বেড়ে গেছে।
এখন থেকে নির্বাচনের সকল দায়িত্ব রিটার্নিং অফিসারদের জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘নির্বাচন হতে হবে সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। ভোট একটি উত্সব। ভোটের দিন ভোটাররা আনন্দমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাবে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথ পালন করবেন। ভোটের বুথ ছাড়া বাকি সব স্থানে পর্যবেক্ষকসহ সবাই যেতে পারবেন এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। যে নির্বাচন জনগণ গ্রহণ করবে, যে নির্বাচন সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে- সেটিই হবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই অবস্থা আপনাদের সৃষ্টি করতে হবে। এখন থেকে নির্বাচনের সকল দায়িত্ব আপনাদের। কিভাবে প্রিজাইডিং অফিসাররা নিয়োগ করবেন, ভোটকক্ষ তৈরি করবেন সব দায়িত্ব আপনাদের। আপনারা সবাই যদি আন্তরিকভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেন, তাহলে সামগ্রিকভাবে আমাদের ওপর জনগণের সন্দেহ হবে না।
সিইসি বলেন, এ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই এমপি বা এমপি ছিলেন। আবার অনেকে এমপি না হলেও তারা এলাকায় সম্মানিত ব্যক্তি। তাদের সাথে যদি সুসম্পর্ক রাখেন, তাহলে কেউই নির্বাচনে সমস্যা সৃষ্টি করবেন না। তাদেরকে কখনো প্রতিপক্ষ হিসেবে নেবেন না। তাদের সহযোগিতা করলে তারাও আপনাদের সহযোগী, বন্ধু হিসেবে কাজ করবেন। বিরোধিতা করবে না। নিরপেক্ষতা হবে একমাত্র মাপকাঠি।
অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পাঁচটি ‘নি’ দিয়ে সজ্ঞায়িত করে বলেন, প্রথম ‘নি’ হচ্ছে নিশ্চয়তা। এটি নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার নিশ্চয়তা। এ নিশ্চয়তার অর্থ ভোটার ও রাজনৈতিক দলে আস্থা সৃষ্টি। দ্বিতীয় ‘নি’ হচ্ছে নিরপেক্ষতা। নির্বিঘ্নে ভোট প্রদান ও ভোট কার্যক্রম চালানোর প্রতিশ্রুতি। কমিশনের পক্ষে এই নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। তৃতীয় ‘নি’ হচ্ছে নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা ভোটার, রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকরভাবে নির্বাচনকালে কমিশনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে আনা অপরিহার্য। চতুর্থ ‘নি’ হচ্ছে নিয়ম-নীতি। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোরভাবে বিধি-বিধান প্রতিপালনের আওতায় আনা প্রয়োজন। আর পঞ্চম ‘নি’ হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচন অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। স্বনিয়ন্ত্রণই নির্বাচন কমিশনের মূল কথা। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নিশ্চয়তা, নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা, নিয়মনীতি ও নিয়ন্ত্রণ কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।
বৈঠকে অংশ নেয়া রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দ্বিতীয়ার্ধে ইসির পক্ষ থেকে নির্বাচনের বিভিন্ন আইন-কানুন সংবলিত পুস্তিকা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়। হাতেগোনা কয়েকটি বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ইসির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল।
আদালতে দণ্ডপ্রাপ্তদের বিষয়ে ইসির আইন শাখার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিম্ন আদালতের সাজা উচ্চ আদালতে স্থগিত না হলে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে আপিল চলমান থাকলেও তা আমলে নেয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে একজন রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রশ্নের জবাবে কমিশনের একজন সদস্য বলেন, এ ধরনের বিষয় থাকলে রিটার্নিং কর্মকর্তারা বাতিল করে দেবেন। পরে কমিশন বিষয়টি দেখবে। ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থীর পক্ষ থেকে কমিশনে আপিলের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থীর উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল সরকারি সুবিধাভোগী হিসেবে মন্ত্রী-এমপিদের প্রটোকলের বিষয়ে তাদের করণীয় কি? জবাবে ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রার্থী হওয়ার পরে সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের কেউই সরকারি প্রটোকল পাবেন না। সব ধরনের সরকারি সুবিধা ত্যাগ করতে হবে। তাদের গাড়িতে পতাকা উড়বে না। তবে যথাযথভাবে তাদের নিরাপত্তা দেবে স্থানীয় প্রশাসন।
কোনো মন্ত্রী যদি ওই এলাকার প্রার্থী না হন তিনি প্রটোকল পাবেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি কাজে তিনি প্রটোকল ব্যবহার করতে পারবেন কিন্তু নির্বাচনী প্রচারে নয়। সরকারি কাজে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিলেও তা আচরণবিধির লংঘন হবে। সে ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে দ্রুত কমিশনকে জানাতে হবে। কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে।
ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পদে থেকে নির্বাচনের সুযোগ পাবেন কি-না রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি কমিশন। এ বিষয়ে কমিশন থেকে পরে পরিপত্র জারি করা হবে বলে বৈঠকে জানানা হয়েছে।
আজ থেকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ব্রিফিং:এদিকে আজ বুধবার থেকে নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে করণীয় বিষয়ে দেশের সব রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফিং করতে যাচ্ছে। রাজধানীর নির্বাচন ভবনে আজ ব্রিফিং হবে ঢাকা ও ময়মনসিং বিভাগের সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের জন্য। এরপর আগামীকাল বুধবার সিলেট, চট্টগ্রাম ও বরিশাল এবং বৃহস্পতিবার রাজশাহী রংপুর ও খুলনা বিভাগের সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফিং করা হবে।