গল্প

ছাতা

‘ও মশাই, ও মশাই।’

মশাই ডাকটা শুনে মনে হলো কলকাতা চলে এসেছি। কিন্তু এই ঝুম বৃষ্টিতে আসলে দাঁড়িয়ে আছি কচুয়া বাজারের একটা ছাউনির তলায়। 

বুড়ো লোকটা আবার ডাকলো, 
‘ও মশাই। আপনাকে ডাকছি।’

এ তো আমাকেই ডাকছে। একটু অবাক হয়ে পেছন ফিরে বললাম, 
‘আমাকে বলছিলেন?’

‘আজ্ঞে। আপনি এনজিওর দাদা না?’

‘হ্যাঁ।’

‘এই ছাতিটা মনে হয় আপনার।’

একটা কাঠের বাটের নিরীহ ছাতা। এই ধরনের ছাতার প্রচলন আজকাল উঠেই গেছে। একটা শিক খুলে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে কোনো এক বৃদ্ধ মানুষের ভুলে ফেলে যাওয়া ছাতা। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার ঠিক এরকম একটা ছাতাই দরকার। 

বাইরে চরাচর ঘোলা হয়ে যাওয়া বৃষ্টি নেমেছে। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে এই শেডের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। এটা মূলত সুপারি বিক্রির শেড। হাটবারে এখানে তিল ফেলার জায়গা থাকে না। আজ মঙ্গলবার বলে একদম ফাঁকা। আমার মতো আট দশ জন লোক বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ঠাঁই নিয়েছে এই শেডের নিচে। 

আমার আরেকটা সমিতিতে যাওয়ার কথা ছিল কালেকশনে। কিন্তু এমন বৃষ্টিতে যাওয়া হবে না। এখন অফিস পর্যন্ত যাওয়াই কঠিন। 

সকালে দিব্যি রোদ ছিল। তাই ছাতা-টাতা নিয়ে আর বের হইনি। এখন অফিসের এই সামান্য দূরে এসে আটকে গেছি বৃষ্টিতে। এই সময় একটা ছাতা বড্ড দরকার ছিল। ফলে কাঠের বাট নাকি স্টিলের, সে নিয়ে ভাবলাম না। একটু হেসে বললাম, 
‘ও হ্যাঁ।’

লোকটা বললো, 
‘ছাতি থাকতি দাঁড়ায়ে আছেন কেনো?’

একটা কিছু উত্তর দিতে হয়, 
‘যে বৃষ্টি। ছাতিতে মানে কী না; তাই দাঁড়ায়ে ছিলাম।’

লোকটা অভয় দিল, 
‘নাহ। মজবুত ছাতি। চলে যাতি পারবেন।’

আমি আর কথা না বাড়িয়ে ব্যাগটা বগলদাবা করে ছাতাটা মেলে ধরলাম। আসলেই মজবুত। খট করে একটা শব্দ হলো। দিব্যি বড় ছাতা; নির্ভর করা যায়। 

প্যান্টের নিচের দিকে সামান্য একটু ভিজে গেলো। তারপরও প্রায় অক্ষত ছিলাম বলা যায়। বৃষ্টিতে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অফিসে এসে পৌঁছলাম। 

অফিসের সঙ্গেই মেস। আগে দৌড়ে মেসে গিয়ে ঢুকলাম। ব্যাগ-ট্যাগ রেখে গোসল সেরে নিলাম। এই সময় আর অফিসের কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। খালা রান্না করে রেখে গেছে- মুরগীর মাংস, আমড়ার টক ডাল আর লাউ শাক। মন্দ না। খেয়ে আর দিন দুনিয়ার খেয়াল না করে বিছানায় চলে গেলাম। 

ঘুম ভাঙল শরীফের চিৎকারে, 
‘এই দরজার কাছে এভাবে একটা ছাতি ফটকায়ে রাখছে কেডা?’

ওহ। নিশ্চয়ই আমার সেই ছাতাটা। শরীফের সঙ্গে পারা যায় না। তারপরও উঠতে উঠতে বললাম, 
‘পানি ঝরানোর জন্য রাখছিলাম।’

শরীফ খ্যাঁক করে ওঠে, 
‘আজও নিশ্চয়ই একটা দুটো কালেকশন না করে চলে এসেছিস।’

‘যে বৃষ্টি। তাতে কালেকশনে যাবো কেমন করে?’

‘স্যার তোরে যেদিন ধরবে, টের পাবি।’

‘স্যারের কথা বাদ দে। এখন ভেতরে আয়।’

আমি এগিয়ে গিয়ে ছাতাটা নিলাম বন্ধ করতে। তখনই লেখাটা চোখে পড়লো। ছাতার কালো কাপড়ে সাদা সুতো দিয়ে লেখা- সুখে থেকো, বাবা।
নিচে লাল টুকটুকে সুতোয় একটু ডিজাইন করে লেখা- নীলিমা। 

বুকটা কেমন ধক করে উঠলো। সেই দুপুর থেকে যেটাকে পড়ে থাকা সামান্য একটা ছাতা বলে মনে হচ্ছিলো, সেটা নিমেষে কেমন একটা বড় কিছু হয়ে উঠলো। বৃষ্টির তোড়ে সে সময় চোখে পড়েনি লেখাটা। এখন মনে হচ্ছে, এটা যেনো সামান্য একটা ছাতা নয়; একটা গল্প। 
ছাতাটা নীলিমার বাবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।  

পরদিন সকালে স্যারের কাছে ঝাড়ি খেয়ে ব্যাপারটা ভুলে গেছিলাম।

আমাদের স্যার বয়স্ক মানুষ। নানা কারণে ম্যানেজার হওয়ার পর থেকে আর কোনো প্রমোশন পাননি। দীর্ঘকাল ধরে এই কচুয়া ব্রাঞ্চেই আছেন। বদমেজাজি মানুষ। অল্পেই খেপে যান। 
কেনো আবার একটা কালেকশন মিস করেছি, এ নিয়ে প্রচুর জ্ঞান ও ঝারি হজম করতে হলো। ফলে ছাতাটা মাথা থেকে সরে গিয়েছিলো। কিন্তু বের হওয়ার সময় দেখি আবার পুব কোণে একটু মেঘ। সঙ্গে সঙ্গে ছাতাটার কথা মনে পড়ে গেল। ফলে ওটাকে সঙ্গে নিয়ে বের হই। 

আগে বাজারে গিয়ে সেই শেডের নিচে বুড়ো লোকটাকে খোঁজ করি। পাই না। ভ্যানে চড়ে আন্ধারমানিক যেতে হবে। ভ্যানে ওঠার ঠিক আগে বুড়োর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। রাস্তার পাশে গোটা কতক কুমড়ো নিয়ে বসে আছে। আগে খেয়াল করিনি। রোজ এখান থেকে ভ্যানে উঠি। এ জন্যই লোকটা আমাকে চিনতে পারে। আমি একটু কাছে গিয়ে বলি, 
‘কালকের ছাতিটা কি আপনার ছিল?’

‘কোন ছাতিটা?’

‘ওই যে, যেটা আমাকে ডেকে দিলেন।’

‘কেনো, ওটা আপনার ছাতি না?’

‘নাহ। আমি তখন মিথ্যে বলেছিলাম।’

বুড়ো লোকটা একটু হাসলো, 

‘এখন পাপ করেছেন মনে হচ্ছে।’

আমি মুখটা একটুও তরল না করে উত্তর দিলাম, 

‘নাহ। পাপ কীসের। বৃষ্টির সময় মালিক ছাড়া ছাতি ছিল। এখন আবার ফিরিয়ে দিলেই হবে।’

‘ফিরিয়ে দেবেন কী করে?’

একটু রাগ হলো, 
‘সে জন্যই তো জানতে চাইলাম। এটা আপনার ছাতি কি না।’

‘আমার না।’

‘তাহলে আপনি বলতে পারেন, ছাতিটা কার?’

‘দাদা, জানলে কী আর আপনাকে দিতাম ছাতিটা?’

একটু বিব্রত হলাম। বললাম, 
‘লেখাটা দেখেন। ছাতিতে একটা লেখা আছে।’

লেখাটা দেখে লোকটা বললো, 
‘নীলিমা নামে কোনো মেয়েকে তো চিনি না।’

‘ঠিক আছে।’

বলে উঠে পড়লাম ভ্যানে। এই বুড়োর কাছ থেকে কিছু জানা যাবে না। এভাবে ছাতার মালিককে খুঁজে পাওয়া কষ্ট। ইংল্যান্ড-আমেরিকা হলে না হয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতো। দিব্যি দেখা যেতো এক ইউরোপীয় বুড়ো এসে ছাতাটা নিজের বলে নিয়ে যেতো। কিন্তু এই কচুয়ায় বসে কীভাবে খুঁজে পাবো ছাতার মালিককে!

প্রথম কালেকশন ছিল আন্ধারমানিকে। 

একটা চাটাইয়ের ওপর বসে একের পর এক সদস্যর বই আর টাকা জমা নিতে থাকি। ছাতার কথা অনেকটা ভুলেই যাই। হঠাৎ কানে আসে এক মহিলার কণ্ঠ, 
‘নীলিমা, আমার বইটা তোরটার সাথে জমা দে।’

সঙ্গে সঙ্গে ছাতাটার কথা মনে পড়ে যায়। মাথা উঁচু করে বলি, 
‘নীলিমা কার নাম?’

বাচ্চা কোলে এক মহিলা উঠে দাঁড়ায়। অল্প বয়স। এই বয়সে কলেজে যাওয়ার কথা মেয়েটির। কিন্তু দিব্যি বাচ্চার মা হয়ে গেছে। হয়তো বড় কোনো সংসার চালায়। মেয়েটাকে ডাকি, 
‘শোনেন, একটা কথা আছে।’

‘স্যার, কন।’

‘আমার কাছে একটা ছাতি আছে। এর মালিককে খুঁজে পাচ্ছি না। সেখানে নীলিমা নাম লেখা। দেখেন তো, ছাতিটা আপনার চেনা কী না।’

ছাতাটা হাতে ধরে লেখাটা দেখে নীলিমা। কিছুক্ষণ দেখে বলে, 

‘না, স্যার। আমি তো এরকম সেলাই পারি না। এটা আমার ছাতি না। আর আমার বাবা মরে গেছে ছোটবেলায়।’

ধুর। এখানেও মিললো না। 

আজ আর কালেকশনে ফাঁকি দিই না। সবগুলো সমিতি শেষ করে তবে অফিসে ফিরে আসি। কপাল ভালো, আগে আসিনি। ম্যানেজার স্যার অফিসে বসে আছেন। 
মাথায় হাত দিয়ে কী যেনো ভাবছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘কী, লাট সাহেব এসেছেন?’

‘জ্বি স্যার।’

‘আজ সব সমিতি করেছেন?’

‘জ্বি স্যার। সবগুলো করেছি।’

‘ঠিক আছে। খাতা জমা দিয়ে মেসে চলে যান।’

বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন স্যার ডাক দিয়ে বললেন, 
‘সামনের সপ্তাহে আমি ছুটিতে যাবো। তিন দিন থাকবো না। অনুপ অফিস চালাবে। সাবধান ফাঁকি দেবেন না।’

‘না, স্যার। ফাঁকি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’

তারপর মুখটা একটু নরম করে বললাম, 
‘স্যার, কী বেড়াতে যাবেন?’

‘তা দিয়ে আপনার কাজ কী!’

এরপর আর কথা চলে না। মেসে ফিরে আসি। অনুপদা খাওয়া শেষ করে একটা বই নিয়ে শুয়ে পড়েছে। বাথরুমে শরীফের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আমাকে দেখে অনুপদা বললেন, 
‘স্যার ছুটিতে যাবেন, শুনেছেন?’

‘হ্যাঁ, দাদা।’

‘ঠিক আছে। রেস্ট নেন।’

পরদিন সকালে একটা ক্লু পেলাম। ভ্যানে ওঠার আগে বুড়ো ডাক দিলো, ‘স্যার, একটা খোঁজ পাইছি।’

‘কীসের?’

‘আপনার ছাতির।’

‘কোথায় পেলেন?’

‘আমাগো প্রাইমারী স্কুলের হেড স্যারের হতে পারে। ওনার মেয়ের নাম মনে হয় নীলিমা।’

সঙ্গে সঙ্গে ভ্যান নিয়ে প্রাইমারি স্কুলে চলে যাই। স্যারকে রুমেই পেয়ে যাই। আমাকে দেখে একটু অবাক হলেন। বললেন, ‘কী বাবু? কিস্তি রেখে আজ স্কুলে?’

‘স্যার, একটা কথা ছিল।’

‘বলেন, বাবু।’

‘এই ছাতিটা কি আপনার?’

স্যার ছাতাটা দেখলেন। বললেন, 

‘নাহ। আমার ছাতি তো এই পাশে রাখা।’

একটু ব্যাখ্যা করে বললাম, 
‘ছাতিটা বাজারে পেয়েছিলাম। কোনো এক নীলিমা তার বাবাকে দিয়েছে।’

‘আমার মেয়ের নাম তো সুচিত্রা।’

এখানেও হলো না। এবার ছাতার চিন্তাটা বাদ দিতে হয়। এর চেয়ে অফিসের চিন্তা করা ভাল। অনুপদা ক্ষমতা পেয়ে গেলেন। চাকুরীতে আমার মাত্র মাস খানেকের সিনিয়র। অথচ স্যার বাইরে গেলেই উনাকে দায়িত্ব দিয়ে যান। আজ স্যারকে একটু ধরবো ভাবলাম। 

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর হিসাব গোছাতে হয়। তারপর বিছানায় না গিয়ে একটু হেঁটে এগোলাম। স্যারের সঙ্গে একটু কথা বলে আসি। 

অফিসের পাশেই একটা দোতলা বাসায় এক রুম নিয়ে থাকেন ম্যানেজার স্যার। গিয়ে দেখি, লুঙ্গি পরে চেয়ারে বসে সকালের পেপার পড়ছেন। আমাকে দেখে বললেন, 
‘কী? ছুটির তদবির নাকি?’

‘না, স্যার। একটা কথা জানতাম।’

‘বলেন।’

‘স্যার কিছু মনে নেবেন না। আমার আর অনুপদার সিনিয়রটি তো প্রায় একই। আপনি বাইরে গেলেই ওনাকে দায়িত্ব দিয়ে যান...’
‘মানে, আপনাকে দেই না কেনো, তাই তো?’

‘জ্বি।’

‘দেখেন দেবু, আপনি আজ পর্যন্ত নিজের কোনো প্রয়োজন ছাড়া অফিসের জন্য স্যাক্রিফাইস করেছেন?’

‘যেমন স্যার?’

‘এই যেমন গত মাসে আমার ছেলে অসুস্থ। ছুটিতে যাবো। সেই সময় অনুপের বোনের বিয়ে। অনুপ বিয়েতে না গিয়ে অফিস করলো। আপনি হলে করতেন?’

একটু আমতা আমতা করলাম। স্যার হাতের পেপারটা রাখলেন। বললেন, 
‘চা খান।’

চুপ করে বসে রইলাম। ভেতর থেকে গরম পানি আর টি-প্যাক নিয়ে এলেন স্যার। টেবিলে রেখে কাপে পানি ঢেলে একটু চিনি মিলিয়ে দিলেন। তারপর হাতে কাপটা দিয়ে বললেন, 
‘দেবু, কেনো ছুটিতে যাচ্ছি, জানেন?’

‘না, স্যার।’

‘পরশু আমার মেয়ের মৃত্যুবার্ষিকী।’

‘স্যার, আপনার মেয়ে মারা গেছেন, এটা জানতাম না। স্যরি।’

‘স্যরি হওয়ার কিছু নেই। বছর চারেক আগের কথা।’

‘কিভাবে মারা গেলেন?’

‘গলায় দড়ি দিয়ে। ওর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা বলে আত্মহত্যা। কিন্তু আমরা জানি, ওকে ওরা মেরে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। মামলা করেছিলাম। টাকার জোরে পারিনি।’
স্যারের মুখটা পাথরের মতো হয়ে আছে। আমি কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। স্যারই একটু থেমে বললেন, 
‘যেদিন ওর মারা যাওয়ার খবর পাই, সেদিনও সারা দিন আমি সমিতির কালেকশন করেছি। কাজ শেষ করে তারপর বাড়ি রওনা দিয়েছি।’

‘স্যরি, স্যার। আপনাকে কষ্ট দিলাম।’

‘সমস্যা নেই। চাইলে খেয়ে যেতে পারেন।’

‘না, স্যার। খেয়ে বেরিয়েছি।’

আমি উঠে আসছিলাম। তখন স্যার পেছন থেকে বললেন,

‘আর আপনি ইদানীং যে ছাতিটা নিয়ে ঘুরছেন; ওটা আমার। আমার মেয়ে দিয়েছিল ছাতিটা।’

ইত্তেফাক/আরএ