এ এইচ এম নোমান
আমাদের দেশ ও বিশ্ব করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে এ অজানা শত্রুকে মোকাবিলা করাই আমাদের প্রধান কাজ। পাশাপাশি দ্বিতীয় কাজ উত্পাদনে গেরিলা রণকৌশল। স্বর্গরাজ্যতুল্য ধনী দেশসহ সব দেশ আজ করোনায় পর্যুদস্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট চীনসহ পরাশক্তির পালটাপালটি খেলা। করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব এবং এর থেকে পাওয়া শিক্ষা ও উপলব্ধি আসন্ন বাজেট প্রণয়ন-দর্শনও বদলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধুর শোষণহীন সমাজব্যবস্থা গড়তে করোনা ভাইরাস থেকে পাওয়া একটি বিশাল শিক্ষা আমাদের দ্বারপ্রান্তে। পৃথিবীব্যাপী সৃষ্টিকর্তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব এক করে ফেলেছেন। কোথাও এখন কোনো মন-চিন্তা-ভাবনার বৈষম্য ও বিভেদ নেই। সব মিডিয়ার একই রকম ভাষা ও সাবধানতা।
বর্তমানে শোষক, শোষণ, তোষণ ও বৈষম্য ভিন্ন চরিত্ররূপে দেশে ফিরাউন, কারুন, আদ, সামুদ, ধনকুবের ও অত্যাচারীদের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। তাদের খোরাকের জন্য মানুষ ও দেশকে ত্রাণ- খয়রাতমুখী না করে অধিকার সংরক্ষণ ভিত্তিক কর্ম-উত্পাদনমুখী জনশক্তি করাই হবে আমাদের শক্তি।
প্রান্তিক জনগণকে সম্পৃক্ত রেখে বঙ্গবন্ধুকন্যা বিকেন্দ্রিক মডেল ভিডিও কনফারেন্সেও বলেছেন, ‘পেটে দিলে পিটে সয়’। পশ্চিমা দেশগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, উন্নয়নে, শৃঙ্খলায় ও ধনে-সম্পদে অনেক ঊর্ধ্বে ও যতই সংকট হোক পুনর্গঠনে এগিয়ে যেতে সক্ষম।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মুক্ত স্বাধীন বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম রামগতির (আমার কর্ম এলাকা) চর পোড়াগাছা গ্রামে গিয়ে স্বেচ্ছাশ্রম, উত্পাদন ও গ্রামোন্নয়নে ডাক দিয়েছিলেন। ঐ ডাকের ফলে রামগতিস্থ বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা বাতিঘর আজ লক্ষ্মীপুর সোয়াবিন জেলা নামে খ্যাত। একই বছর ৪ এপ্রিল ১৯৭২ ময়মনসিংহের এক সভায় সমবায় ও গ্রামকেন্দ্রিক উত্পাদন ও কুটিরশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। করোনা ক্রান্তিলগ্নে এখনো জাতির পিতার দেশজ উন্নয়ন রণকৌশলের পুনরাবৃত্তি করাই হবে আমাদের পথ ও পাথেয়। এযাবত্ যেসব বিধিমালা, অনেক প্রণোদনা বিশেষ করে—প্রান্তিক চাষিদের আমাদের প্রস্তাবিত ৫ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ধন্যবাদ। আসছে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী সমীপে আমরা বিনীত কিছু প্রস্তাব করছি :১. সামাজিক নিরাপত্তা জাল আওতার বর্তমানে দেশে কমবেশি ৭ লাখ মা গর্ভকালীন ভাতা পাচ্ছেন। একটি ইউনিয়নে গড়ে ৭০-৮০ জনের বেশি সাত শর্তযুক্ত গরিব মা গর্ভবতী হয় না। তাই সঠিক নিয়মনীতি উদ্দিষ্ট বাস্তবায়ন লক্ষ্যে প্রকৃত মা নির্বাচনের জন্য ও ‘গর্ভকালীন ভাতা’র গুণমান ধরে রাখার জন্যই সংখ্যা না বাড়িয়ে মেয়াদকাল ৩ বছরের স্থলে স্কুল ভর্তি পর্যন্ত ডাটাবেজসহ ৫ বছর করা ও ভাতার পরিমাণ ৮০০ টাকার স্থলে গার্মেন্টস শ্রমিক মজুরিসম ৮ হাজার টাকা প্রদানের দাবি করছি। ২. দারিদ্র্যের উত্স বন্ধের দিকে নজর না দিলে দারিদ্র্য বিমোচন হবে না। এসডিজির ১৭ এজেন্ডার ১ নম্বর এজেন্ডা ‘দারিদ্র্য বিমোচন’ কল্পে গর্ভকালীন ভাতাকেন্দ্রিক স্বপ্ন প্যাকেজ কর্মসূচিই হতে পারে এর মূল ভিত্তি। দেশের ১ কোটি বটমলাইনিং দরিদ্র মা কে টার্গেট করে ২০ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদে বছরে ৫ লাখ মাকে টার্গেট করে ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়নের আবেদন করছি। তাহলে কেউ স্বাস্থ্য পুষ্টি স্যানিটেশান, শিক্ষা, গৃহ, কর্মসংস্থানহীন থাকবে না। ৩। স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি ত্রাণসহায়তা অব্যাহত রাখতে ঘোষিত ১ কোটি রেশন কার্ড স্থায়ী ডাটাবেজ রাখতে হবে। পাশাপাশি লোভী ব্যবসায়ী, ধনীলুটেরা, ঐচ্ছিক ঋণখেলাপি, তৈল মর্দনকারী, স্বার্থসিদ্ধির অভিলাষী, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, করফাঁকিদারী, অর্থ পাচারকারীদেরকে নজরদারিতে এনে বর্জন এবং তাদের তালিকা প্রকাশ ও কর আদায় করতে হবে। যেমনভাবে অসহায় কর্মহীন দরিদ্র, শোষিত ও বঞ্চিতদের রেশন কার্ডর্ভুক্ত তালিকা করা হচ্ছে। ৪। দুর্যোগ মোকাবিলায় সমবায়-বিআরডিবি, পিকেএসএফ-এনজিও ও ব্যাংক থেকে প্রদত্ত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম লেনদেনে নমনীয়/প্রণোদনা/সুদহীন কার্যকর নীতি প্রদান করা। এ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম মন্দা ঠেকাতে সফলতা ২০০৯-১০ সালে সারাদেশে প্রমাণিত। ৫। সরকার প্রদেয় প্রণোদনাকে ব্যাবহারিক করে মাছ, মুরগি, গবাদিপশু (মামুগ)-সহ সকল কৃষি-অকৃষি উত্পাদন অর্থনৈতিক চালিকা শক্তিকে পরিকল্পিতভাবে বেগবান ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কাজ করতে হবে। ৬। বর্তমানে ভাইরাসের ফলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে দেখা যায় ক. পরিবেশগতভাবে রাজধানীসহ সব শহর-গ্রাম তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। খ. দেশে চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী, ইয়াবা, মাদক, ক্যাসিনো মোটা দাগে নাই। গ. তবে রাজধানীসহ সারাদেশে সকল নামি দামি প্রাইভেট হাসপাতাল পরিচালনায় লোভ ও ব্যাবসায়িক সম্প্রদায় দেশবাসীকে হতাশ করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি স্বাস্থ্য-হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে গবেষণা সাপেক্ষে ইতিবাচক দিকগুলোকে এগিয়ে নিতে হবে। ৭। প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ব্যাবহারিক বিকেন্দ্রীকরণ করাই হবে মুজিববর্ষের গ্রাম বাংলা জেলার জন্য সেরা উপহার। (ক) প্রত্যেক জেলায়, জেলা সেবক আওতায় স্থানীয় সরকার প্রাধান্যে কার্যক্রমসমূহ পরিচালিত হবে। (খ) কেন্দ্রীয় সরকারের বিভাগীয় প্রতিনিধিরা জেলা সেবকের আওতায় ন্যস্ত থাকবে। (গ) জেলা সরকার (পরিষদ) কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিত ও স্ব-শাষিত বিধি, নীতি ও পন্থায় বাস্তবায়ন জবাবদিহিতায় থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকার তদারকি করবেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ, ৩১টি নির্দেশনা বিশেষ করে জেলা প্রশাসক সঞ্চালককেন্দ্রিক সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তদারকি ও জবাবদিহিতায় এনে সকল পর্যায়কে সম্পৃক্ত করে এক মডেল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। বিকেন্দ্রিক মডেলটি ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের জনপ্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বমূলক কার্যক্রম সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্তিকরণ একটি সংস্কার দিকদর্শন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘পদ্মা সেতু নিজের টাকায় করব’ ছিল বিশ্ব পরিমণ্ডলে একটি সংস্কার ঘোষণা। করোনাপ্রসূত উদ্ভাবিত মডেলটি জেলা প্রশাসনসহ বিভাগীয় সব কর্মকর্তা একটি ছাতার আওতায় কাজ করবেন। ছাতা প্রধানের নাম হবে জেলা সেবক। যিনি জেলার নির্বাচিত প্রতিনিধি (জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান)। এই সেবক পরিষদের সাচিবিক দায়িত্বে যিনি থাকবেন, পদবি হবে প্রধান সঞ্চালক (জেলা প্রশাসক)। জেলায় কর্মরত বিভাগীয় প্রধান ও অন্য সংশ্লিষ্টরা সেবক পরিষদ সঞ্চালক সদস্য থাকবেন। এ প্রসঙ্গে অর্গানোগ্রাম, কার্যপরিধি ইত্যাদি বিস্তারিত রূপরেখা একটি জনমুখী কমিটি কর্তৃক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তৈরি হবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স সঞ্চালন ও তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার পদ্ধতি এখানে সূত্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ বিশ্বকে সমতালে আনা এ ধ্বংসলীলার জমিন থেকে ‘সৃষ্টির একটি কৃষ্টি, প্রকৃতি, কৃষি-উত্পাদন জলবায়ু’ অর্থনৈতিক মুক্তির বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে। মা-মাটি, মানুষ ও খেত-খামার ইত্যাদির ওপর জোর দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। পৃথিবীটাকে মাথা উঁচু করে আবার দেখিয়ে দেওয়ার সময় এখনই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে সে আহ্বানই জানিয়েছেন।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও স্বপ্ন প্যাকেজ প্রবর্তনকারী সংগঠন- ডর্প।