বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ

ডা. নাছির উদ্দিন,  ডা. দেলোয়ার হোসেন

মোল্যা রেজাউল করিম

বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন যে পৃথিবীতে প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণী রয়েছে যা সামগ্রিকভাবে জীববৈচিত্র্য হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এই প্রজাতির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১.২ মিলিয়ন প্রজাতি চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে বেশির ভাগ হলো পোকামাকড় এবং অধিকাংশ রহস্যে ভরা। জীববৈচিত্র্যের সব উপাদান বৈশ্বিক বাস্তুতন্ত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনের জন্য বেশ গুরুত্ব বহন করে। জীববৈচিত্র্যের অন্যতম অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে অন্যতম হলো বন্যপ্রাণী, যা মানুষের দ্বারা পালিত হয় না বা একটি অঞ্চলে বন্যভাবে বেড়ে ওঠে।

বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে রয়েছে আর এই হুমকির মাত্রা একেক এলাকায় এক এক ধরনের। ডব্লিউডব্লিউএফের রিপোর্ট অনুযায়ী  ১৯৭০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৬০ শতাংশ জীববৈচিত্র্যে (স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর এবং মাছ) হ্রাস পেয়েছে। সুনির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোতে ১৯৭০ সাল থেকে মিঠা পানির প্রাণী কমেছে ৮৩ শতাংশ। সামগ্রিক পতনের পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট প্রাণী, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল সেগুলো হলো বনরুই, বাঘ, গন্ডার এবং আফ্রিকান হাতি। বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি প্যাঙ্গোলিন শিকার হয়, প্রতি ৩০ মিনিটে একটি হাতি মারা যায়, প্রতি ৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি গন্ডার তার শিঙের জন্য মারা হয়।

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান প্রধান কারণগুলো মানব সৃষ্ট, মানুষের ক্রিয়াকলাপগুলো অগ্রহণযোগ্য হারে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে এবং বর্তমান এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সুস্থতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

এরই মধ্যে অনেক কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, যা পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্য হ্রাস করার জন্য দায়ী। জীববৈচিত্র্য হ্রাস করার জন্য দায়ী অন্যতম কারণগুলো হলো আবাস হ্রাস এবং অবক্ষয়, প্রজাতির অত্যধিক শোষণ, দূষণ, আক্রমণাত্মক প্রজাতি এবং রোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি। বন্যপ্রাণী কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড়ো কারণ প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস, যা কৃষিজমি তৈরির জন্য হয়ে থাকে। পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ ভূমি এখন মানব ক্রিয়াকলাপ দ্বারা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৮ সালে বিশ্বে ১২ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি হারিয়ে গেছে, যার গতি এখনো বিশ্ব জুড়ে চলমান। খাবারের জন্য বন্যপ্রাণী হত্যা জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ, শুধু খাবারের জন্য পৃথিবিতে ৩০০-এরও বেশি স্তন্যপায়ী প্রজাতি বিলুপ্তির পথে রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন এমন একটি সমস্যা, যা গত ১০০ বছরে গড়ে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা ০.৭৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেয়েছে, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলেছে এবং চরম ঘটনাগুলোর ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং প্রকৃতি বাঁচাতে আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ করতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে সম্মিলিত প্রয়াসে।

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে বাঁচাতে এখনই সময় এগিয়ে আসার। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর জাতিসংঘ জীববৈচিত্র্যের বিষয়গুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে এবং সচেতনতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্যের (আইডিবি) দিবস পালনের তারিখ ঘোষণা করেছে, যা প্রতি বছর ২২ মে সারা বিশ্বে পালিত হয়। আমরা এমন এক মুহূর্তে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস পালন করতে যাচ্ছি যখন সারা বিশ্ব ঘরে বন্দি আছে কোভিড-১৯-এর মতো মহামারির কারণে।

বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যে বাংলাদেশের ১৩৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৭১১ পাখি, ১৭৩ সরীসৃপ, ৬৪ উভচর, ৬৫৩ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ, ১৮৫টি ক্রাস্টেসিয়ান এবং ৩২৩ প্রজাতির  প্রজাপতি রয়েছে। 

 আইইউসিএন রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ (২০১৫) বাংলাদেশের ১৬১৯ প্রজাতির প্রাণীর মূল্যায়ন করেছে যার মধ্যে ৩১টি প্রজাতি (২ শতাংশ) আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত, পাঁচটি প্রজাতি (৩.৪৫ শতাংশ) গুরুতর বিপন্ন, ১৮১ প্রজাতি (১১.১৮ শতাংশ) বিপন্ন, ১৫ প্রজাতি (৯.৪৫ শতাংশ) ছিল ) ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, ৯০ প্রজাতি (৬ শতাংশ) হুমকির কাছে এবং ৮০২ প্রজাতি (৫০ শতাংশ) উদ্বেগহীন অবস্থায় আছে। বাংলাদেশের আইইউসিএন রেড লিস্টে ৩৮টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৯ পাখি, ৩৮ সরীসৃপ, ১০ উভচর, ৬৪ মাছ, ১৩ ক্রাস্টেসিয়ান এবং ১৮৮ প্রজাতির প্রজাপতি হুমকির মধ্যে রয়েছে। সুতরাং, জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং বাস্তুতন্ত্রের পরিষেবাগুলোর প্রবাহ ঠিক রাখতে দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য কাজ অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। যে কোনো মানবিক বিপত্তি প্রতিরোধ করতে আমাদের অবশ্যই নীতিনির্ধারক এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি দেশের জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে।

পৃথিবীতে বসবাসের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সংকল্প নিয়ে, কিছু উদ্যোগী মানুষের হাত ধরে ২০১৪ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) গঠন করা হয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে মানুষকে সচেতন করতে এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিবিসিএফ কাজ করে যাছে। বিবিসিএফ সারাদেশে অনাথ, জব্দ করা বা উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীর সেবা, পুনর্বাসন এবং পরিচর্যায়, দেশের সামাজিক বনাঞ্চল সংরক্ষণে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে বন বিভাগকে সহায়তা করে যাচ্ছে। দেশের ১০৭টি প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা বিবিসিএফের ছত্রছায়ায় কাজ করে যাচ্ছে এ সংগঠনের অধিভুক্ত ১১ হাজারের বেশি পরিবেশ কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে।