পাখি

শালিকের ঘর-সংসার

 

বই পড়ছি, ফেসবুকে  ইন করছি, বের হচ্ছি আর চুপি চুপি দেখছি শালিকপাখির ঘর-সংসার। দুটি শালিক— একটি বেশ সুঠাম, ভারিক্কি কণ্ঠস্বর, একে কম দেখা যায়; ভাবে মনে হলো তার অন্য আর দু্-এক জায়গায় প্রেয়সী রয়েছে। হঠাত্ হঠাত্ এসে দেখে যায় মেয়ে শালিকটি ঘর ঠিকঠাক মতো বানাচ্ছে কি না, ধমকধামকও দিয়ে যায়। গলায় এমন একটা ঝাঁজালো ভাব যে ওর অবাধ্য হওয়া মেয়ে পাখিটি কখনো কল্পনাও করতে পারবে না। দিনে দিনে নিখুঁত পরিপাটি এক বাসা বানিয়েছে খড়কুটো দিয়ে। এমন দুর্ভেদ্য বাসা যে এর ভেতরে আলোর এক কণাও ঢুকতে পারবে না। ডিম পেড়েছে কি না দেখার জন্য দু-একবার উঁকি দিতে গিয়েও ফিরে এসেছি। শালিক দুটিকে খুব ঘন ঘন একসঙ্গে দেখা যায়। তারা মনের আনন্দে গান গাইতে থাকে। মাঝে মাঝে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় বলেও মনে হয়। আবার অনেক সময় তাদের বন্ধুবান্ধবরাও  আড্ডা দিতে আসে। আমাকে দেখলেই ফুড়ুত করে উড়ে যায়। আমি বারান্দার পর্দা ভালো করে টেনে রাখি। ছেলেকে বলি—ওদের বিরক্ত করবা না, পশ্চিমের রুমে এবং বারান্দায় প্রয়োজন ছাড়া যাবা না।

কিন্তু ওদের চ্যাঁচামেচি এত বেড়েছে যে, সেটাকে পাখির গান বলে মনে হয় না, রীতিমতো ঝগড়াঝাঁটি পর্যায়ে পড়ে। এরই মধ্যে বারান্দায় জমা পাখির বিষ্ঠা কালবৈশাখী ঝড়-বৃষ্টিতে গন্ধ ছড়াতে লাগল। লক্ষ করলাম পাখি এখন রাতেও বাসায় থাকতে শুরু করেছে, পালাক্রমে থাকে বলে মনে হলো। বুঝলাম বাসায় ডিম পেড়েছে। একদিন মন্ময় বলল, মা তিনটি ডিম পেড়েছে—কোয়েল পাখির ডিমের মতো। আমি মৃদু বকলাম ওকে, আর উঁকি দিতে বারণ করলাম। আমার খুব ভালো লাগছিল যে মন্ময় চোখের সামনে পাখির বাসা বানানো দেখছে, ডিম থেকে বাচ্চা হওয়া দেখবে। আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে, নানা রঙের পাখি, পাখির বাসা এসব নিয়ে কত সুখ-দুঃখের গল্প গেঁথেছি ছোট্টবেলায়।

একদিন সকাল দশটা হবে—রান্নাঘরে কাজ করছি। ছেলে এসে হাত ধরে টানতে টানতে পশ্চিমের বারান্দায় নিয়ে গেল আমাকে, কাঁদো কাঁদো অবস্থা, মা কী হলো পাখির বাচ্চার? দেখি মেঝেতে একটি ছোট্ট সোনারঙা পাখির বাচ্চা, চোখ দুটি ফোটেনি, মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, কয়েকটি পিঁপড়া ভিড় করেছে বাচ্চাটি ঘিরে, পিঠের কাছে হালকা পাতলা কালো পালক। বুকটা ছ্যাত করে উঠল। কে করল এই সর্বনাশ! দেখি সামনে দিয়ে একটি কাক উড়ে গেল। মন্ময় বলল, আমি এখানে কাক দেখেছি একটু আগে।

আমি আশার শেষ তৃণখণ্ডটি আশ্রয় করে বাসার ভিতরে হাত দিলাম, কোনো বাচ্চা বেঁচে আছে কি না? না সব শূন্য। আমার মন্ময়ের মনটা ভেঙে যেন খানখান হয়ে গেল। আমি দ্রুত ওকে ওখান থেকে সরিয়ে আনলাম; বোঝালাম, বাবা এই পৃথিবীটা এমনই এক নিষ্ঠুর জায়গা যেখানে চোখ খুলে পৃথিবী দেখার আগেই শত্রু হানা দিতে পারে। টিকে থাকার লড়াইয়ে বাচ্চা তিনটি হেরে গেছে। আমি আমার ছেলেকে প্রায়শই  পাখি  বলে ডাকি। ওকে বুকে জড়িয়ে বললাম—পাখি মন খারাপ কোরো না, বড়ো হতে হতে এরকম অনেক কিছুই দেখতে হবে তোমাকে।

আজ প্রায় দিন পনেরো হলো সেই যে মা শালিক আর বাবা শালিক আমাদের ছেড়ে গেছে—আর আসেনি, একবারের জন্যও না।