বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে অসংগতি কেন

যদিও প্রবল ঝড় আম্ফান মূলত আঘাত হানিয়াছে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা এবং আশপাশের এলাকায়, কিন্তু এই বিশাল ঝড়ের ছোঁয়া লাগিয়াছে বাংলাদেশেও। আর সেই ছোঁয়াতেই যে ক্ষতির সম্মুখীন হইয়াছে দেশ তাহা নেহাত কম নহে। কমবেশি ২৬টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। কৃষিমন্ত্রী জানাইয়াছেন,  পৌনে ২ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হইয়াছে। আমের ভরা মৌসুম হওয়ায় রাজশাহী অঞ্চলে নষ্ট হইয়াছে প্রচুর আম। সবচাইতে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হইয়াছে উপকূলীয় অঞ্চলের বাঁধগুলি। আর এই বাঁধ ভাঙিয়া যাওয়ায় ব্যাপক অঞ্চল প্লাবিত হইয়াছে,  স্থল অভ্যন্তরে বিশাল অঞ্চলে ঢুকিয়া পড়িয়াছে লোনা পানি, যাহার কারণে মাছের খামার ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীনও হইয়াছে। ধ্বংস হইয়াছে অনেক পোলট্রি ফার্ম। প্রাণ গিয়াছে কমপক্ষে ২৪ জনের।

এই বাঁধ লইয়াই আমাদের কিছু বক্তব্য আছে। আমাদের দেশে, বিশেষ করিয়া উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধগুলি তৈরি করা হইয়া থাকে জলোচ্ছ্বাসের কথা মাথায় রাখিয়া। পাড়গুলি যাহাতে না ভাঙে সেইদিকে লক্ষ রাখা অতি জরুরি একটি বিষয়। এই বাঁধগুলি সংস্কারে কোনো নজর দেওয়া হয় না।  কেন হয় না তাহার উত্তর অনেকের নিকটই নাই। এই বাঁধের দায়িত্ব মূলত পানি উন্নয়ন বোর্ডের। এই পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রহিয়াছেন বিভিন্ন স্তরের প্রকৌশলী।  প্রধান প্রকৌশলী হইতে শুরু করিয়া উপসহকারী প্রকৌশলী পর্যন্ত রহিয়াছেন। অঞ্চলভিত্তিক রহিয়াছেন প্রকল্প পরিচালকগণ। জেলা পর্যায়ে রহিয়াছেন তিন-চার স্তরের প্রকৌশল কর্মকর্তারা। তাহাদের নিকট যদি আমরা প্রশ্ন রাখি, বুকে হাত দিয়া বলেন, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে সরেজমিনে কয় বার গিয়াছেন? তাহার উত্তর মিলিবে না। অধিকন্তু একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষ ও বিবিধ দায়িত্ব পালনের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হইয়া থাকে। সরকার বহু চিন্তাভাবনা করিয়া তাহার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোয়ালিটি কন্ট্রোল অ্যান্ড এস্যুওরেন্স সেলের কার্যক্রম পুনর্বণ্টন করে বাস্তবায়নাধীন নদীতীরের সংরক্ষণকাজ, নদী খনন, খাল খনন ও পুনঃ খনন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, নূতন বাঁধ নির্মাণ প্রভৃতি কাজের গুণমান নিশ্চিতকরণ, পরিমাণ পরিবীক্ষণ ও যাচাইয়ের জন্য টাস্কফোর্সের জোনভিত্তিক কমিটি গঠন করা হইয়াছে। এই টাস্কফোর্স কী কাজ করিয়া থাকে তাহা জনগণের নিকট মোটেই স্পষ্ট নহে। যদি ইহার প্রয়োজনীয়তা থাকে, তাহা হইলে নিয়মিত পদ সৃষ্টি করা যাইতে পারে। ইহাকে বিধিসম্মত করিয়া লইতে পারেন।

আমরা জানি যে বলিয়াও কোনো কাজ হইবে না, তবুও  দেশ ও জনগণের চিন্তা মাথায় রাখিয়া বলিয়া যাই। সংশ্লিষ্টদের নিকট প্রশ্ন থাকে, সিডরের সময় যে বাঁধগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল তাহা এখনো সংস্কার হয় নাই কেন? আমরা শুনিয়াছি এক দায়িত্বশীল, প্রজ্ঞাবান  ও অভিজ্ঞ মানুষ সরকারের ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকিয়াও একাধিকবার তাগিদ দিয়াছিলেন ঐগুলি সংস্কারের। হয় নাই। প্রশ্ন হইল, এখন হইতে ৬০-৬৫ বত্সর পূর্বে তৈরি করা বাঁধ যদি সংস্কার করিতে না পারেন, তাহা হইলে নূতন প্রকল্পে হাত দেওয়া কেন?  এই নূতন প্রকল্পের মধ্যে কিন্তু দুষ্ট লোক নানা ভেলকি খেলার হদিস খুঁজিয়া পায়। যতটুকু করিবেন ততটুকু খাসা হইতে দোষ কোথায়? এই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে দেশ ও জনগণের কাজে আসিবে।