সর্বক্ষেত্রে সমন্বয় প্রয়োজন

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের কারণে যে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হইয়াছে, যে সামাজিক দুর্গতি তৈরি হইয়াছে, তাহা কাহারো একার সমস্যা নহে। অর্থাত্ একক ব্যক্তি, একটি প্রতিষ্ঠান অথবা একটি দেশের নহে।  বিশ্বব্যাপী সমাজের সর্বস্তরের মানুষকেই এই মন্দার অংশীদার হইতে হইয়াছে। যদি উত্পাদনমুখী শিল্পকারখানার কথা বলা হয়, তাহা হইলে ইহা মনে রাখা অতি জরুরি যে গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা না থাকিলে উত্পাদনের কোনো মূল্য নাই। উত্পাদক শ্রমিক না পাইলে অথবা কাঁচামাল কারখানায় না পৌঁছাইলে তিনি উত্পাদনই বা করিবেন কী করিয়া? মার্কেটে কাঁচামালের উত্স ও উত্পাদন হইতে শুরু করিয়া গ্রাহক পর্যন্ত একটি চেইন। এই চেইনের কোনো একটি স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হইলেই মার্কেট ভারসাম্যহীন হইয়া পড়ে। আর বর্তমান বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস এমন কোনো স্তর নাই যাহাকে স্তব্ধ করিয়া দেয় নাই। ফলে আমরা কী দেখিতে পাইতেছি? বিশ্বব্যাপী কলকারখানা এমনকি সেবামূলক হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। কোনো প্রতিষ্ঠান লে অফ ঘোষণা করিতেছে, কোনো প্রতিষ্ঠান দেউলিয়াত্বের জন্য আবেদন করিতেছে। আর এইসব প্রতিষ্ঠান কোনো রুগ্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল না। রীতিমতো দাপাইয়া ব্যবসায় করা বহু প্রতিষ্ঠান এখন ছিদ্র হইয়া যাওয়া বেলুনের মতো চুপসাইয়া গিয়াছে। দক্ষিণ অমেরিকার সর্ববৃহত্ এয়ারলাইনার লাটাম ২৬ মে দেউলিয়াত্বের জন্য আবেদন জানাইয়াছে। এয়ার কানাডা, যুক্তরষ্ট্রের এয়ার ডেলটা এয়ারলাইনস, ভার্জিন অস্ট্রেলিয়া হইতে শুরু করিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রনিকস অথবা ব্রিটেনের রোলস রয়েসের মতো জাঁদরেল কোম্পানিগুলি গড়ে ২০ হইতে ৩০ শতাংশ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়াছে। অর্থসংকট তৈরি হইয়াছে স্বাভাবিক আয় না থাকিবার কারণে।  উল্লেখ্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উন্নত বিশ্বের কোম্পানিগুলি লে অফ করিলে শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি ক্ষতিপূরণ বিমা কোম্পানিগুলি দিয়া থাকে। তাহা নির্ভর করে বিমার ধরনের উপর। সে যাহাই হউক, আগেই বলা হইয়াছে, বিপদে কেবল শ্রমিক পড়েন নাই, বিশ্বব্যাপী বহু বাণিজ্যিক ব্যাংক, কোম্পানিরও ঐ লে অফের শিকার শ্রমিকের মতনই অবস্থা দাঁড়াইয়াছে। তাই বড়ো বড়ো ধনী দেশগুলি অর্থনীতিকে গতিশীিল রাখিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ অর্থনীতিকে খানিকটা হইলেও চাঙ্গা রাখিবার জন্য ডলার ছাপাইবার সিদ্ধান্ত লইয়াছে। ইউরোপ এমনকি ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকও নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে বাণিজিক ব্যাংক ও ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানগুলিকে চাঙ্গা রাখিতে।

বাংলাদেশেও একই সমস্যা উপস্থিত হইয়াছে। বহু কোম্পানি বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। বহু প্রতিষ্ঠান শ্রমিকের বেতন-ভাতা দিতে গলদঘর্ম হইতেছে।  অথচ তাহাদেরও কোনো আয় নাই। এই রকম অবস্থায় বাংলাদেশেও বহু প্রতিষ্ঠানের সম্মুখে পথ খোলা থাকিবে হয় লে অফ অথবা দেউলিয়াত্ব। ইহা বিশ্বব্যাপী চিত্রেরই ক্ষুদ্র অংশ। সরকারও এই সময় নানামুখী জটিলতার সম্মুখীন হইতেছে। তাই ভাবিতে হইবে, সংকট আছে আর সেই সংকটের মধ্য দিয়াই বাঁচিয়া থাকিবার এমনকি প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিবার চেষ্টা চালাইতে হইবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের সমন্বয়কে মাথায় রাখিতে হইবে।