করোনা-পরবর্তী সংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি

সিকদার আনোয়ার

 সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কবিতা করোনাকালে ভাইরাল হয়েছে। কবিতার নাম বা রচয়িতার নাম জানা যায়নি। দুটো লাইন এরকম, ‘এ যাত্রায় রেহাই যদি পাই, অন্যের কথা ভাববো...এ যাত্রায় বেঁচে যদি যাই, অন্যদের আগে বাঁচতে দেব’। এতে প্রতিভাত হয়  মানুষ আজ কত অসহায়! ভাবনার বিষয়, করোনা দুর্যোগ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহলে করোনা-পরবর্তী মানবসংস্কৃতির কি পরিবর্তন হতে পারে।

করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছেন, দিচ্ছেন। আর এসব ভবিষ্যদ্বাণী প্রধানত অর্থনৈতিক অবস্থা কী হবে বা হতে পারে তা নিয়ে। তাছাড়া পুঁজিবাদের প্রসার বা অন্তর্ধান নিয়ে কিংবা আন্তর্দেশীয় বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি নিয়েও কমবেশি আলোচনা রয়েছে। করোনা-পরবর্তী বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্যসংকট, চরম বেকারত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন অনেকে। অন্যদিকে মানবজাতির সংস্কৃতি তথা সম্পূর্ণ জীবনধারণের রীতিপ্রকৃতি, আচার-আচরণ, স্বভাবচরিত্রের ওপর কতখানি প্রভাব বিস্তার করবে বা কতটুকু পালটে দেবে তার হিসাবনিকাশ করছেন কেউ কেউ। করোনা মহামারি কি সংস্কৃতির স্বাভাবিক ধীরলয়ের পরিবর্তনে দুর্বার গতি এনে দেবে?

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সরকারের প্রত্যয় ও কর্মসূচিকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে করোনা। নিজ নিজ আবাসস্থলে অবস্থান করে অফিস-আদালত, জরুরি এমনকি স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে অনেক সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। লকডাউন মেনে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অফিসে কাজকর্ম চলছে। ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে এখন আর শুধু সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মিটিং হয় না, বলতে গেলে সব ধরনের সভা এমনকি পেশাজীবী সংগঠন বা সমিতিগুলোর সভাও অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। অনলাইন বেচাকেনা এবং হোম ডেলিভারি এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে কোম্পানি বা ফার্মগুলো অর্ডার নিতে পারছে না আর অর্ডার নিলেও রীতিমতো এক দুই সপ্তাহ পরে মালামাল বাসায় পৌঁছে দিতে হচ্ছে। এটিএম বুথ, মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড স্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন অনলাইন ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম জোরদার করেছে। করোনাকালীন অনলাইন বা ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির হার ৪০-৫০ শতাংশ বলে জানা যায়। সরকারি-বেসরকারি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার বা আইএসপিগুলো সেবাপ্রত্যাশীদের চাহিদা মোতাবেক সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। করোনা-পরবর্তীকালে এই ডিজিটালাইজেশনের ফলে সবার আইটি-দক্ষতা বাড়বে, সময় ও অর্থসাশ্রয় হবে, স্বচ্ছতা বাড়বে, দুর্নীতি কমবে এবং পরিবেশ দূষণ কমবে।

লকডাউন বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে সবাইকে একটা দীর্ঘ সময় নিজ গৃহে অবস্থান করতে হয়েছে, হচ্ছে। অফিস-আদালতে প্রলম্বিত ছুটি, কলকারখানা দীর্ঘ সময় বন্ধ, গণপরিবহন বন্ধ বা যাতায়াতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কিংবা কড়াকড়ি প্রভৃতি কারণে এ ছাড়া বিকল্প ছিল না। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘ সান্নিধ্যের কারণে বা একসঙ্গে খাবারদাবার গ্রহণের ফলে অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধি পাবে, গৃহস্থালির কাজে পরিবারের সব সদস্যের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে, সহমর্মিতার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। গৃহস্থালি কাজের কষ্ট ও গুরুত্ব পুরুষরা অনুধাবন করবে এবং এতে নারী পুরুষের মধ্যে সমঝোতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পাবে।

করমর্দন করা আমাদের সমাজে একটি প্রথা, এতে আন্তরিকতা, হূদ্যতা বা সৌজন্য ইত্যাদি প্রকাশ পায়। জাপানিরা শারীরিক স্পর্শ বা করমর্দন পছন্দ করে না, দূর থেকে শরীর বাঁকা করে স্বাগত জানায়। আমেরিকানরা ন্যূনতম দূরত্ব বজায় রেখে অভিবাদন জানায়। কিন্তু সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে করমর্দন প্রচলিত আছে, পারস্পরিক স্পর্শ আন্তরিকতা হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতে নিজের দুই হাত একসঙ্গে মিলিয়ে নমস্কার জানানো হয়। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় করমর্দন না-করাটাই মঙ্গল বলে অনেকে মনে করেন। করোনা-পরবর্তীতে আমাদের দেশ থেকে করমর্দন প্রথা কি বিলীন হয়ে যাবে?  

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে নিজ বাসা আঙিনা, অফিসসহ সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হয়েছে। অন্যদিকে সাবানপানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড বিশেষ কায়দায় দুই হাত ধৌত করা, হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু/রুমাল মুখে দেওয়া বা  কনুই দিয়ে আড়াল করা, নোখ ছোটো রাখা, পরিধেয় বস্ত্র নিয়মিত ধৌত করা, বাহির থেকে ঘরে ফিরে এসে ভালো করে গোসল করা, বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখা—এসব ভালো অভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়া জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুবই কার্যকরী। অনেকের দীর্ঘদিনের কু-অভ্যাস করোনার কারণে দূরীভূত হতে পারে বলে আশা করা যায়।

শিল্পসাহিত্য-সংস্কৃতিতে করোনার প্রভাবও ইতিমধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। করোনাসংক্রান্ত বহু ছড়া, কবিতা, নাটিকা, কৌতুক সোশ্যাল মিডিয়ায় গিজগিজ করছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এবং অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র যথাক্রমে ‘অল কোয়েটেড অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ (১৯৩০) এবং ‘ব্যালাড অব আ সোলজার’ কিংবা রোগ মহামারির ওপর ভিত্তি করে ইতিমধ্যে সাড়া জাগানো  চলচ্চিত্র ‘কন্টাজিয়ন’ (২০১১), ‘ব্লাইন্ডনেস’ (২০০৮), ‘আউটব্রেক’ (১৯৯৫), ‘দ্য এন্ড্রোমেডা স্ট্রেইন’ (১৯৭১) এবং ‘পেনিক ইন দ্য স্ট্রিট’ (১৯৫০)-কে ছাড়িয়ে করোনার শিক্ষাপ্রসূত ক্ষমতার দম্ভের স্থায়িত্বহীনতা, আধিপত্য বিস্তারের অশুভ মোহ, আভিজাত্যের দর্পচূর্ণ, ভোগবিলাসের করুণ পরিণতি, অপরিকল্পিত বিনিয়োগের পরিণতি, পরিবেশ সংরক্ষণে উদাসীনতা, অদৃশ্য শক্তির বন্দনা ইত্যাদি বিষয়কে উপজীব্য করে আরো চিত্তাকর্ষক, আরো আবেগময়, আরো শিক্ষণীয়  নোবেল, অস্কার বা গোল্ডেন বিয়ার জেতার মতো কাব্য, উপন্যাস, চলচ্চিত্র বা শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে।

গল্প, নাটক বা উপন্যাসে প্লেটোনিক প্রেমকে ‘করোনিক প্রেম’ অর্থাত্ দয়িত-দয়িতার মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মেলামেশা করা হিসেবে আখ্যায়িত করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ব্রেক আপের পর প্রেমিক-প্রেমিকা একে অন্যকে হয়তো বলবে ‘তোমার জন্য আমার বাসা লকডাউন অথবা  ছেলে বা মেয়ে সারা দিন বাসায় রুমে বসে থাকলে অবাক মা হয়তো জিগ্যেস করবে, ‘কি ব্যাপার, সারা দিন সেলফ কোয়ারেনটাইনে আছিস কেন?’ 

যুবক-যুবতিদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি ও আনুষ্ঠানিকতা বেড়ে যেতে পারে ত্রিমুখী আহ্বান ও প্রচারণা—অর্থাত্ স্বীয় উপলব্ধি, মা-বাবা বা মুরুব্বিদের পুনঃপুন আহ্বান এবং ধর্মযাজকদের প্রচারণার মাধ্যমে। ধর্মীয় ভাবাবেগ বা আনুগত্য শুধু যুবক-যুবতি নয়, সব বয়সের লোকদের মধ্যেই বেড়ে যাবে। ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা বলা যায় না। বিভিন্ন ধরনের অনুমান, ধারণা করা যায় মাত্র। আশাবাদীদের ধারণা করোনা যে শিক্ষা দিয়েছে তার ফলে বিশ্ববাসী অর্থনীতি, খাদ্য, চিকিত্সা, ব্যবসা, সামরিক ব্যয় প্রভৃতি নিয়ে নুতন করে ভাববে। সেখানে মানুষের কল্যাণসাধন, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, অনিশ্চয়তা দূরীকরণ ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য পাবে। অন্যপক্ষের ধারণা করোনার বিপর্যয়ের ফলে অতিশয় সচেতনতা, নিজস্ব নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাওয়ার কারণে চরম স্বার্থপরতা, এককেন্দ্রিকতার সৃষ্টি হতে পারে, যা বিশ্বে উগ্র জাতীয়তাবোধকে উসকে দিতে পারে। ফলে বৈশ্বিক, রাষ্ট্রীয় এমনকি সমাজে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিবর্তে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। তৃতীয় মত হচ্ছে, আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিই না সুতরাং আমরা আগের মতোই থাকব।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সচিব, প্রাক্তন রেক্টর,

বিসিএস প্রশাসন একাডেমি