কোভিড-১৯ :ইউরোপের সফল দেশ কারা?

নাদিরা মজুমদার

অবশেষে ইউরোপের দেশগুলোতে কোভিড-১৯-এর চাবুক এখন ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছে। তবে এই ভাইরাসকে ঠেকানোর কৌশল নিয়ে ইউরোপ দুই অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের সম্পদশালী দেশগুলো কোভিড-১৯-কে নিয়ে (জার্মানি বাদে) হিমশিম অবস্থার মধ্যে পড়ে, কিন্তু ইইউ-র মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো মসৃণভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলার দক্ষতা দেখায়।

ইউরোপের এই রোগ ভিত্তিক বিভক্তিতে ‘লকডাউন’ ব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে বটে তবে ক্রাইসিস মোকাবিলার প্রশ্নে লকডাউন ছাড়াও মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর সহজ স্বকীয় কিছু গুণাবলীকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। এই প্রসঙ্গে পরে ফিরে আসছি। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসেই পশ্চিমা জগত্ (যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ন্যাটো) ‘কোভিড-১৯’-এর (নামকরণ তখনো হয়নি) আগমনবার্তা সম্বন্ধে অবহিত ছিল। জানুয়ারি মাসেই সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে ‘ব্যাপক কানেকটিভিটি’-র সুবাদে রোগটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়বে এবং পড়বে ‘অ-রৈখিকভাবে’ (নন-লিনিঅরিটি)। পরিসংখ্যানবিদরা ‘অ-রৈখিকতা’-কে পান্ডেমিকতুল্য কিছু একটা আসছে বলে ধরে নেন এবং তারা ভাইরাসটির গঠন (স্ট্রাকচার) ও ক্রমবৃদ্ধি জানতে আগ্রহী হন। তারা কি করেন? কম্পিউটারে ইনপুট হিসেবে কিছু উপাত্ত প্রবিষ্ট করেন। যেমন : মানব শরীরে ভাইরাসের সু্প্তাবস্থা অথবা ’এলোপাথারি’ (র্যানডম) রূপান্তর (যা ‘অজানা, এবং জানা সম্ভব নয়’) নির্ধারণ, অথবা কাঁচাবাজার, প্লেনে ভ্রমণ (অস্বাভাবিক মিথষ্ক্রিয়া) ইত্যাদি, বা নেটওয়ার্কিং-এর সুবাদে প্রাপ্ত মানবীয় কনট্যাক্ট (গুণনীয়ক হারে প্রবৃদ্ধি), অথবা উল্লিখিত সব কয়টিকে ইনপুট উপাত্ত হিসেবে ঢোকানোর পরে কম্পিউটার যে রেজাল্ট দেয় সেগুলো অনুপাতহীন অসামঞ্জস্য। লকডাউনের ভরামৌসুমের দিনগুলোতে এই আসমঞ্জস্যতা আমরা শুনেছি, দেখেছি। এমন এক পরিস্থিতিতে লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের ‘পুরানো’ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর নীল ফার্গুসন সাহয্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ১২ মার্চ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রণকে প্রেরিত গোপন নোটে জানান যে. ‘এমনভাবে চললে’ অর্ধ মিলিয়ন ফরাসির মৃত্যু অনিবার্য। আতঙ্কগ্রস্ত ম্যাক্রণ সেইদিন সন্ধ্যায়ই সুস্থ-অসুস্থ নির্বিশেষে সবার জন্য লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব পালনের ঘোষণা দেন। প্রফেসর ফার্গুসন বিগত বিশ বছর ধরে যুক্তরাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা বিধায় ১৬ মার্চ প্রকাশ্যে বলেন যে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে কমসে কম সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে না, এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনায়াসে ১২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটবে। প্রফেসর ফার্গুসন ব্রিটিশ সরকারকে লাস্ট মিনিটে নীতিগত প্রশ্নে পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেন।

ইতিপূর্বে কোনো মহামারি- সিনারিয়োতেই, সুস্থ-অসুস্থ নির্বিশেষে লকডাউন নামক এমন কাঠামোগত কট্টর ব্যবস্থা ব্যবহার হয়নি। প্রফেসর ফার্গুসন যদিও চিকিত্সক নন, মহামারি বিষয়ক প্লিতও নন, একজন পরিসংখ্যানবিদ, ‘মডেলার’। তাঁর মডেলের ওপর ভরসা করে প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ‘পাগলা গরুর বেরাম’ থেকে রেহাই পেতে ২০০১ সালে ৬ মিলিয়ন গবাদিপশু হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১০ বিলিয়ন পাউন্ড। পরবর্তীকালে সিদ্ধান্তটি ভ্রান্ত ছিল বলে মনে করা হয়। ২০০৫ সালের ‘বার্ড ফ্লু’র সময় ফার্গুসন বলেছিলেন যে, যুক্তরাজ্যে মৃত্যুর সংখ্যা হবে ৬৫ হাজারের বেশি। বাস্তবে সংখ্যাটা ছিল ৪৫৭। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার জগতে পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে ব্যবহূত ব্যবস্থার ফলাফল মূল্যায়নে পরিসংখ্যান ব্যবহার স্বাভাবিক, কিন্তু ভাইরাসের আচরণ সম্বন্ধে কি ভাবিকথন করা যায়? অবশ্য তিনি পরে স্বীকার করেন যে কোভিড-১৯-এর পরিসংখ্যানগত হিসাবনিকাশ করতে তেরো বছরের পুরানো ইনফ্লুয়েঞ্জার উপাত্ত ব্যবহার করেছিলেন। সঙ্গত কারণেই তিনি ‘প্রফেসর লকডাউন’ শিরোনাম অর্জন করেন। ইউরোপের দুই অংশের প্রসঙ্গে ফিরে আসছি। মার্চ-এপ্রিলের সেই দিনগুলোতে, যখন মিডিয়ার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে: ‘অতোজনের’ রোগসংক্রমণ হয়েছে, এবং ‘অতোজন’ মারা গেছে-জাতীয় ব্রিফিং শুনে শুনে আমরা বিষণ্নতার চরম স্তরে চলে গেছি, আতঙ্কিত হয়েছি—সেইদিনগুলো আর নেই, অতীত। অবশিষ্ট রোগিরা সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছে, কালেভদ্রে নতুন সংক্রমণের বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো ক্রমশ লকডাউনের কড়াকড়ির মাত্রা কমিয়ে আনছে, যেমন : ১৮ মে থেকে চেক প্রজাতন্ত্রের জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে অস্ট্রিয়াসহ পূর্বাংশের অন্যান্য দেশগুলোও ‘নতুন নর্মাল’-এ ফিরে আসছে। মুখোশ পরার প্রশ্নে যেনোবা আর বাধ্যবাধকতা নেই, কেবলমাত্র সুপার মার্কেট, ডিপার্টমেন্ট স্টোর ইত্যাদি জনসমাগমের স্থানে মুখোশ পরার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, ডাক্তারের কাছেও ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে, মুখোশ পরে যেতে বলা হচ্ছে চেক প্রজাতন্ত্রে। আপাতদৃষ্টে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সংক্রমণের হার ও মৃত্যুহারের মধ্যে লক্ষণীয় বৈষম্য দেখা যাচ্ছে, এরজন্য অবশ্য একাধিক কারণ সংশ্লিষ্ট। যেমন : একীভূত সমরূপের ‘মেথোডলজি’ ব্যবহার হয়নি। ফলে, সমরূপের ‘মেথোডলজী’ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি মিলিয়নে সংক্রমণের ও মৃত্যুর হারের হিসাবনিকাশ না হওয়া পর্যন্ত ইইউ-র দেশগুলোর তুলনামূলক চিত্র পেতে অপেক্ষা করতে হবে।

লকডাউনের ভূমিকা কি? দেখা যাক। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার তিন সপ্তাহ বাদে ৯ মার্চ ইতালি যখন জাতীয় কোয়ারেন্টাইন ঘোষণা করে দেশটিতে তখন সুস্থ-অসুস্থ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, ইতালি তখন কোভিড-১৯-এর এপিসেন্টার। এমনি এক পরিস্থিতিতে চেক প্রজাতন্ত্র প্রথমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং প্রাগ-ভিয়েনা সমঝোতার মাধ্যমে দুই দেশের সীমান্ত বন্ধ করা হয়, অর্থাত্ ‘লকডাউন’ করা হয়। অতঃপর যেসব দেশের পারস্পরিক কমন-সীমান্ত রয়েছে সেই দেশগুলোও দ্রুত লকডাউনের পন্থা অনুসরণ করে। এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের এইসব দেশের সরকার সুস্থ-অসুস্থ একাকার হওয়ার পূর্বেই অসুস্থদের পৃথকীকরণে সমস্ত সময় ও সামর্থ্য নিয়োজিত করে। যেমন : সীমান্তের প্রবেশমুখেই স্বাস্থ্যগত পরীক্ষাকরণ, সন্দেহজনককে হাসপাতালে পাঠানো ইত্যাদি। বলা প্রয়োজন, এই ‘লকডাউন’-এর সিদ্ধান্ত প্রতিটি দেশ ‘জাতীয় পর্যায়ে’ গ্রহণ করে, এবং ফলস্বরূপ ‘শেঙ্গেন স্পেসের’ অভ্যন্তরীণ ‘নো বর্ডার’ নীতি লুপ্ত হয়, অর্থাত্ ‘মুক্ত চলাচল’ বাতিল হয়। অন্যভাবে জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন স্টেট যার যার জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। তাই ‘লকডাউন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে মুক্ত চলাচলে বাধা পড়ায় ব্রাসেলস কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছিল বটে কিন্তু কোভিড-১৯-এর প্রথম আলামত পাওয়া মাত্রই জার্মানিও লকডাউন করে, এবং ‘প্রফেসর লকডাউনে’র ভয়ঙ্কর হিসাবনিকাশে আতঙ্কিত ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যখন তাদের চালুকৃত ‘হার্ড ইমিউনাইজেশন’ প্রজেক্ট থেকে সরে আসে ও লকডাউন করে তখন কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে, সুস্থ-অসুস্থ শনাক্ত করা দুরূহ হয়ে পড়ে । তবে সুইডেন তার ‘হার্ড ইমিউনাইজেশন’ প্রজেক্টে অটল থাকে ও সফল হয়। লকডাউনের মাধ্যমে জাতীয় সার্মথ্যের সব সবটুকু ‘অজ্ঞাত ও জ্ঞাত’ রোগীর পেছনে ব্যয়ের মূল্যবাবদ প্রতিদিনের জীবনের স্বাভাবিক চিকিত্সাব্যবস্থাকে কাটছাঁট করা হয়, যেমন : কেবল ওষুধের দরকার হলে ডাক্তারকে ফোন করো, ডাক্তার মোবাইন ফোনে প্রেসক্রিপশন পাঠিয়ে দেবেন, যদি খু-উ-ব দরকার হয় তবে প্রথমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করো, গ্লাভস, মুখোশ পরে, সামাজিক দূরত্ব ইত্যাদি পালন করে ডাক্তারের কাছে যাও। একইভাবে, ‘হতেই-হবে’-র ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের অপারেশনগুলোকেও স্থগিত রাখা হয়। বর্তমানে গড়ে দশ সপ্তাহ বাদে সাধারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

যে কোনো সংকটই চ্যালেঞ্জের। সংকটের শুরুতে দ্রুত, যুক্তিসিদ্ধ ও যৌথ উপায়ে এর মোকাবিলা করতে হয়। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো ‘কোভিড-১৯’-কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। তারা সফল হয়েছে। আপাতদৃষ্টে মনে হয় যে লিবারেল ব্যবস্থাধীনে থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সংকট মোকাবিলায় ‘কালেকটিভ মেমোরি’ সবসময়ই মূল্যবান অ্যাসেট রূপে কাজ করে। তাই ‘গুড প্র্যাকটিসে’র দৃষ্টান্ত হিসেবে কেউ এদের উল্লেখ না করলেও কিছু আসে যায় কি? না, তবে করলে ভালো লাগত বইকি! এশীয় দেশগুলোর ‘গুড প্র্যাকটিসে’র দৃষ্টান্তের উল্লেখও তো কোথাও দেখা যায় না! আরেকটি বিষয় : লকডাউনের শিকল মোচন ঘটিয়ে কবে ‘শেঙ্গেন স্পেস’ শর্তহীন ভাবে পুনর্বহাল হবে, বলা কঠিন!

লেখক : বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

nadirahmajumdar@gmail.com