ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুন

বাঁচতে গিয়ে প্রাণ হারালেন পাঁচ জন

জীবন বাঁচাতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তারা। অথচ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারাতে হলো। দায়িত্বরত স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বার্থপরতা, অবহেলা আর কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় মরতে হলো চিকিত্সাধীন পাঁচ রোগীকে। মর্মান্তিক এ ঘটনার শিকার হওয়া রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের সেবামূলক মানসিকতার অভাবই প্রাণ কেড়ে নিয়েছে অসহায় পাঁচ রোগীর। একটি হাসপাতালের আইসিইউতে অচেতন ও চলচ্ছক্তিহীন রোগীরা থাকে। আগুন লাগার পরে তাদের না সরিয়ে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেরা বাঁচতে হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন। অথচ আইসিইউতে যে ধরনের বেড থাকে তা খুব সহজেই সরানো যেত।

রাজধানীর গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে বুধবার রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছে। তবে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট ঘাটতি পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। হাসপাতালের আটতলাবিশিষ্ট মূল ভবনের পাশে একতলা করোনা ইউনিটে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। একতলা ভবনটিতে স্টিলের পিলার দিয়ে তাঁবু টাঙিয়ে বর্ধিত করা হয়েছে। সেখান থেকে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট অথবা এসি বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।

ইউনাইটেড হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) মো. মইনুল বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায়              এ মৃত্যুর বিষয়ে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। মামলার বিষয়ে গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম বলেন, মামলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো অভিযোগ করেননি। বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার রাতেই পুলিশের উপস্থিতিতে পাঁচ জনের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যার প্রধান করা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) দেবাশীষ বর্ধনকে। অপর তিন জন হলেন—সদস্য সচিব ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিং কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বাবু চক্রবর্তী, সদস্য উপ-সহকারী পরিচালক নিয়াজ আহমেদ ও গুলশান-বারিধারা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আবুল কালাম আজাদ।

বুধবার রাতের ঐ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন রিয়াজুল আলম (৪৫), খাদেজা বেগম (৭০), ভ্যারন এ্যান্থনি পল (৭৪), মো. এনির হোসেন (৭৫) ও মো. মাহাবুব এলাহী চৌধুরী হিরো (৫৭)।  এদের মধ্যে খাদেজা বেগম ও মাহাবুবের করোনা পরীক্ষায় দুই বার নেগেটিভ ফল এসেছিল। নিহত মাহাবুবের বড়ো ছেলে আমান চৌধুরী বলেন, মহাখালীর ক-৮৫/৭ নম্বর বাড়িতে তারা থাকেন। বাবা মোবাইল ফোনসেটের ব্যবসায়ী। গত ১৫ মে শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় বাবাকে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়। করোনা টেস্টে তার দুই দফা নেগেটিভ আসে। বুধবার সন্ধ্যায় তিনি চিকিত্সকদের সঙ্গে দেখা করে বাবাকে ছাড়পত্র দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। রাত ১০টার দিকে তিনি খবর পান যে করোনা ইউনিটে আগুন লেগেছে। তিনি অভিযোগ করেন, অব্যবস্থাপনার কারণেই তার বাবা দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন।

যেভাবে আগুনের সূত্রপাত

হাসপাতালের মূল ভবনসংলগ্ন করোনা ইউনিটের আইসোলেশন সেন্টারে বুধবার রাত ৯টা ৫৫ মিনিটের দিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে চিকিত্সক ও নার্সরা প্রাণ ভয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসেন। ফায়ার সার্ভিস জানায়, আগুন লাগার খবর পেয়ে তাদের তিনটি ইউনিট ঘটনার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ততক্ষণে করোনা ইউনিটে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। হাসপাতালের ভেতরের দিকটাও ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। ফায়ার সার্ভিস ২০ মিনিট চেষ্টা করে আগুন নিভিয়ে ফেলে। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, আগুনের কারণ অনুসন্ধানে ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েক ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।

অগ্নিনির্বাপণে অব্যবস্থপনা

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন। তিনি বলেন, করোনা ইউনিটের কাছেই ফায়ার হাইড্রেন্ট ছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বোধ হয় তা ব্যবহার করতে পারেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে দাবি করেছে যে, তারা ফায়ার স্টিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিল। অথচ তারা সে চেষ্টা করেনি। কারণ, ফায়ার স্টিংগুইশারগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। এগুলো তো কাজই করবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার স্টিংগুইশার রাখার দায় হাসপাতাল এড়াতে পারে না। তাদের উচিত ছিল এগুলো আরো দেড় মাস আগেই রিফিল করা। অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা তদন্ত করছি। অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিস পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, করোনার আইসোলেশন সেন্টারে ডাক্তার ও নার্স ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তারা দ্রুত বের হয়ে গেলেও রোগীরা বের হতে পারেনি। তিনিও জানান, ভবনে ১২টি মেয়াদোত্তীর্ণ অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে করোনা ইউনিটে ছিল আটটি।

বুধবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আইসোলেশন ইউনিটে ফায়ার ফাইটার, ফায়ার ড্রিল যারা করে তাদেরও একটা টিম রাখা প্রয়োজন ছিল।

হাসপাতালের

দুঃখ প্রকাশ

এদিকে, অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করেছে। হাসপাতালের কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট শাখার প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার রাতে হাসপাতালের মূল ভবনের বাইরে কোভিড আইসোলেশন ইউনিটে সম্ভবত বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুন আইসোলেশন ইউনিটে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় আবহাওয়া খারাপ ছিল এবং বিদ্যুত্ চমকাচ্ছিল। বাতাসের তীব্রতায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে পাঁচ জন রোগীকে বের করে আনা সম্ভব হয়নি।