লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা এলাকায় ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসন প্রত্যাশীকে হত্যা করেছে মানব পাচারকারীরা। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার, দোষীদের যথাযথ শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের এই আহ্বানের পর লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিজদাহের সুরক্ষা বিভাগকে অপরাধীদের গ্রেফতার এবং তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য সব পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ মিজদাহ শহরের হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আহত ১১ জনের উন্নত চিকিত্সার জন্য ত্রিপোলির বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহত তিন জনের শরীর থেকে গুলি বের করার জন্য অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং আহতদের সুচিকিত্সা নিশ্চিত করতে দূতাবাসকে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিজদাহতে (ত্রিপোলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে) ২৬ বাংলাদেশিকে লিবিয়ার মিলিশিয়ারা গুলি করে হত্যা করে। আক্রান্তদের মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশির সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় দূতাবাসের। তিনি দূতাবাসকে জানান, উপকূলীয় অঞ্চল যুওয়ারা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে ইতালির দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা ছিল পাচারকারীদের। বেনগাজি থেকে মরুভূমির রাস্তায় যুওয়ারা যাওয়ার পথে তারা মিলিশিয়া বাহিনীর দুস্কৃতিদের কবলে পড়েন। অপহরণের পর মিজদাতেই প্রায় ১৫ দিন অপহরণকারীদের জিম্মায় ছিলেন অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশি ও সুদানি নাগরিকরা।
অপহরণকারীদের সঙ্গে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি চলছিল। আটককৃতদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কাঙ্ক্ষিত মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয় তারা। মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আটককৃতদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে অপহরণকারীরা। এক পর্যায়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে থাকা সুদানি নাগরিকরা অপহরণকারী চক্রের এক সদস্যকে মেরে ফেলেন। এরপর অপহরণকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে মারা যান ২৬ জন।
গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় কয়েক জন ভেতরেই পড়ে ছিলেন, দুই-একজন আহত অবস্থায় বের হয়ে আসেন। তাদের দেখে স্থানীয় লোকজন সেনাবাহিনীকে খবর দেয় এবং সেনাবাহিনী তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। প্রাণে বেঁচে যাওয়া ঐ বাংলাদেশি একজন লিবীয় নাগরিকের আশ্রয়ে আত্মগোপনে আছেন। এই খবর আসার পর দূতাবাসের কর্মকর্তারা মিজদাহ হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আহতদের প্রাথমিক চিকিত্সার ব্যবস্থা করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, আমাদের মিশন লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে অনুরোধ জানিয়েছে। আমরা দাবি করেছি ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং দোষী ব্যক্তিদের তথ্য আমাদের দেওয়ার জন্য। লিবিয়ার এ ঘটনায় যেসব বাংলাদেশি বেঁচে আছেন, তাদের বরাত দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এখানে মূল ঘটনাটা হচ্ছে, তারা ৮ থেকে ১০ হাজার ডলার খরচ করে গিয়েছিলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশ সরকার সব প্রকার মানব পাচারের বিরোধী এবং মানব পাচার রোধে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যার ফলে বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের সংখ্যা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এ সমস্যা নির্মূলের লক্ষ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায়ের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পার হয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিবাসন প্রত্যাশীরা। এদের মধ্যে বহু বাংলাদেশিও রয়েছেন। মানব পাচারকারীদের মাধ্যমেই তারা ভূমধ্যসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দেন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহু বাংলাদেশির সলিল সমাধিও হয়েছে।
লিবিয়ায় নিহত ২৩ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে!
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, লিবিয়ায় হতাহতদের মধ্যে ‘নিখোঁজ বা মৃত’ হিসেবে ২৩ জনের এবং আহত হিসেবে ১১ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। ‘নিখোঁজ বা মৃত’ ২৩ জন হলেন- গোপালগঞ্জের সুজন ও কামরুল; মাদারীপুরের জাকির হোসেন, জুয়েল ও ফিরোজ, রাজৈরের বিদ্যানন্দীর জুয়েল ও মানিক, টেকেরহাটের আসাদুল, আয়নাল মোল্লা ও মনির, ইশবপুরের সজীব ও শাহীন, দুধখালীর শামীম; ঢাকার আরফান; মাগুরার লাল চান্দ; কিশোরগঞ্জের ভৈরবের রাজন, শাকিল, সাকিব ও সোহাগ, রসুলপুরের আকাশ ও মো. আলী, হোসেনপুরের রহিম এবং যশোরের রাকিবুল।
আহত ১১ জন হলেন, মাদারীপুর সদরের তীর বাগদি গ্রামের ফিরোজ বেপারী, ফরিদপুরের ভাঙ্গার দুলকান্দি গ্রামের সাজিদ, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শম্ভপুর গ্রামের জানু মিয়া, ভৈরবের জগন্নাথপুর গ্রামের সজল মিয়া, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বামনডাঙ্গা বাড়ির ওমর শেখ, টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের তরিকুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার বেলগাছির খেজুরতলার বকুল হোসাইন, মাদারীপুরের রাজৈরের কদমবাড়ির মো. আলী, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সখিপুরের মওটুলীর সোহাগ আহমেদ, মাদারীপুরের রাজৈরের ইশবপুরের সম্রাট খালাসী (২৯) এবং চুয়াডাঙ্গার বাপ্পী। এরা সবাই ত্রিপোলি মেডিকেল সেন্টারে চিকিত্সাধীন রয়েছেন।
হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি ১৬ সংগঠনের
লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত মানবপাচারকারী চক্রকে দ্রুত গ্রেফতার ও শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলোর জোট সিভিল সোসাইটি ফর গ্লোবাল কমিটমেন্টস অন মাইগ্রেশন (সিজিসিএম)। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, এই চক্রকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িতদের সবাইকে খুঁজে বের করতে বিভিন্ন দেশকে প্রয়োজনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এভাবে যেন আর কোন অভিবাসী সেখানে প্রাণ না হারায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে জোর ভূমিকা পালন করতে হবে।
সিজিসিএম-এর সদস্যসমূহ হলো ব্র্যাক, বিএনএসকে, আইআইডি, ওকুপ, ওয়ারবী, বিএনপিএস, আসক, বিলস, বিএনডব্লিউএলএ, বোমসা, এসিডি, আওয়াজ, ফিল্মফরপিস, কর্মজীবী নারী, ডেভকম, ইমা, মাইগ্রেশন নিউজ এবং এসএনএ।