ইত্তেফাক ডেস্ক
লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশিকে পাচারকারীরা নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলার তরুণ ও যুবক রয়েছেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারগুলোর শোকাহত অবস্থা নিয়ে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বামনডাঙ্গা গ্রামের তরুণ সুজন মৃধা (২০)। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর দালাল চক্র একটি শহরে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। দালাল চক্র পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। সুজনের বাবা কাবুল মৃধা বলেন, এ মাসের ১৬ তারিখে ছেলে একটা অডিও রেকর্ডিং পাঠায়, সেখানে ছেলের আকুতি “আব্বু আমাকে বাঁচাও, আমাকে মেরে ফেলবে”।
যশোর : ‘আমাগের আর ছাদের বাড়ি লাগবে না। সংসারির সুখ লাগবে না। তুই ফিরে আয় বাজান; ফিরে আয়! আপনেরা আমার সোনারে আমার কাছে আইনে দ্যান!’ লিবিয়ায় নিহত রাকিবুলের মা মাহেরুন নেছার এমন বুকফাটা আর্তনাদে শোকে বিহ্বল হয়ে গেছে খাটবাড়িয়া গ্রাম। মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার খাটবাড়িয়া গ্রামের ইসরাইল হোসেনের ছেলে রাকিবুল ইসলাম রাকিব (২০) লিবিয়ায় যান।
মাদারীপুর ও টেকেরহাট : লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের আক্রমণে হতাহত বাংলাদেশিদের মধ্যে মাদারীপুরের নিখোঁজ, মৃত ও আহতের বাড়িতে বইছে শোকের মাতম। তেমনি রাজৈর উপজেলার রাজন্দী দারাদিয়া এলাকার নিখোঁজ আসাদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থ্য বাবা বিছানায় সন্তানের জন্য কাতরাচ্ছেন। তাদের একটি দাবি, আসাদুল যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করে সরকার। এ ঘটনায় মাদারীপুর জেলায় নিখোঁজ ১৩ জন ও আহত হয়েছেন ৪ জন। এদিকে লিবিয়ায় হতাহতের ঘটনার খবর শুনে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বাংলাদেশি দালাল মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের জুলহাস শেখ এর বাড়িতে হামলা করে নিখোঁজ যুবকদের অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
মাগুরা : মহম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুর ইউপির নারায়ণপুর গ্রামের সন্তান লালচাঁদ (৩০)। তিনি মো. ইউসুফের ছেলে। লাল চাঁদের স্ত্রী ও একটি শিশুসন্তান রয়েছে। লাল চাঁদের মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসছে। বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। খবর পেয়ে মহম্মদপুর থানার পুলিশ কর্মকর্তা তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন।
ফরিদপুর : দালালদের দাবি করা ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে রাজী হয়েছিলেন। পুরো পরিবার মিলে চেষ্টা করছিলেন এই টাকা জোগারের। এর মধ্যেই খবর এলো- যার জন্য মুক্তিপণ দিবেন, সেই ছেলেই চলে গেছে না ফেরার দেশে। বলা হচ্ছে লিবিয়ায় দালালদের গুলিতে নিহত ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লবদি ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা কামরুলের কথা। কামরুলের বাড়িতে চলছে এখন শোকের মাতম। কামরুলের স্ত্রী ও দুই বছরের ছেলে সন্তান রয়েছে। নিহত কামরুলের পিতা কবির শেখ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পাশাপাশি পরিবারের স্বচ্ছ্বলতার কথা ভেবেই তাকে বিদেশ পাঠানোর তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু স্বপ্ন পূরণতো দূরের কথা উল্টো লিবিয়া থেকে দালালরা ফোন করে ১০ লাখ টাকা দাবি করে আসছিলো কিছুদিন যাবত।
ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) : স্বপ্নের দেশ ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন পুরণ হলো না কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ৮ যুবকের। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে মানব পাচারকারীরা। নির্মম এই হত্যাকান্ডের পর থেকে ভৈরব উপজেলার ৮ জন যুবকের সন্ধান মিলছে না। এরমধ্যে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারিয়েছে বলে জানা গেছে। আর বাকী ৩ জন যুবক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সন্তান হারা পরিবারের সদস্যরা। শনিবার সকালে এই তথ্য নিশ্চিত করেন ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুবনা ফারজান। নিহতরা হলেন, উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের মেহের আলীর ছেলে সাদ্দাম হোসেন আকাশ, শ্রীনগর ইউনিয়নের বাচ্চু মিলিটারির ছেলে শাকিব ও শিবপুর ইউনিয়নের শম্ভুপর গ্রামের মুখলেস মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ আলী এবং ভৈরববাজারের অধির চন্দ্র ঋষির রাজন চন্দ্র ঋষি। আর নিহত শাকিলের এখনও সঠিক নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি।