অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম কতখানি কার্যকর?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ করোনা মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই চালাইয়া যাইতেছে। কোভিড-১৯-এর কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, পরিবহন ইত্যাদির মতো শিক্ষা খাতও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। ভয়াবহ করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে গত ১৮ মার্চ হইতে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রহিয়াছে। ইহাতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষার অনিশ্চয়তায় রহিয়াছে। উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থায় সেশন জটের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা স্কুলে গিয়া পড়াশুনা করিতে না পারায় তাহারা মানসিকভাবে কিছুটা হইলেও ক্ষতিগ্রস্ত। এই অবস্থায় স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথমে টেলিভিশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে পড়াশুনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ইহার পাশাপাশি অনেক বেসরকারি স্কুলকলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। গত ৩০ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রীর সহিত অনুষ্ঠিত এক সভায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; কিন্তু এই সংক্রান্ত সক্ষমতা না থাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মধ্যে এই ব্যাপারে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

আসলে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন নূতন নহে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংক্রান্ত কর্মসূচি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনপ্রিয়ও বটে। তবে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষিতে সামগ্রিকভাবে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিছু সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অনলাইনে অ্যাসাইনমেন্ট ও হোমওয়ার্কও দিতেছেন। এমনকি অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণও চলিতেছে। তবে অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা সরাসরি ক্লাস ও পরীক্ষার চাইতে বেশি কার্যকর নহে। ইহার অনেক প্রতিবন্ধকতাও বিদ্যমান। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কুলকলেজের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের। আর্থিক সংকটের কারণে অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করিতে পারে না। অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণের মতো অনেকেরই নাই স্মার্ট মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ। অসচ্ছলতার কারণে নাই ইন্টারনেট বিল বা মোবাইল ডাটা ব্যবহারে খরচ চালাইবার সক্ষমতা। ইহাতে যে বৈষম্য তৈরি হয় তাহা অপ্রত্যাশিত। আবার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার অবকাশ নাই বলিলেই চলে।

উন্নত দেশসমূহ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশ তাহাদের শিক্ষার্থীদের জন্য ই-লার্নিং বা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করিলেও অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলি পড়িয়াছে বিপাকে। চীন জুম অ্যাপসের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষা চালাইতেছে যাহা অনেকটা কার্যকর; কিন্তু এইজন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ডিভাইসে যে উচ্চ ইন্টারনেট গতিসম্পন্ন সংযোগ থাকা প্রয়োজন, তাহা আমাদের অনেক ক্ষেত্রে নাই। তাহা ছাড়া গ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধার রহিয়াছে আরো অভাব। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক লেকচারে কীভাবে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেনটেশন (পিপিটি) ও মালটিমিডিয়া ব্যবহার করিতে হয় তাহা জানেন না। এই সংক্রান্ত তাহাদের প্রশিক্ষণও নাই। তাই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বাংলাদেশে এখনো চ্যালেঞ্জস্বরূপ। ইহার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ফলাফল তৈরি ও মূল্যায়নের সময় এখনো আসে নাই। তবে আমরা আশা করি, ব্যাপক ডিজিটালাইজেশনের ফলে অদূর ভবিষ্যতে এই সকল প্রতিবন্ধকতা আর থাকিবে না। ইহা কার্যকর করিতে সরকার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা দিতে পারে। কিংবা ইহার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাইয়া নিতে সাধারণ ছুটির পর প্রয়োজনে শুক্র ও শনিবার অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়।