উষ্ণতায় ক্ষেপে উঠছে বঙ্গোপসাগর

শাকিল আহমেদ

পৃথিবীর শতকরা ৮০ ভাগ ঘূর্ণিঝড়গুলোর উত্পত্তি বঙ্গোপসাগর থেকে হয়েছে। বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর সামুদ্রিক অঞ্চলের মাত্র ০.৬ শতাংশ দখল করে আছে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত উপকূলীয় এলাকায় সবচেয়ে  বেশি প্রাণহানি ঘটে। গত দুই শতাব্দীতে ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত ২০০ বছরে পৃথিবীতে মোট মৃত্যুর ৪২ শতাংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উচ্চতা অনেক কম হওয়ার কারণে তা সহজেই প্লাবিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কারণে বিশাল জলরাশি প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হয়। এর ফলে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। তাছাড়া বঙ্গোপসাগরের ত্রিভুজাকৃতির কারণে ঘূর্ণিঝড়গুলো বঙ্গোপসাগরকে ফনেলের মতো ব্যবহার করে। যা ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। যে কারণে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়। গত কয়েক দশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমেছে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সৃষ্টি হওয়া বিক্ষুব্ধ প্রকৃতিকে মানুষের বশে আনার সাধ্য কোথায়?  কোনো স্থানে বায়ুর তাপ বৃদ্ধি পেলে সেখানকার বায়ু ওপরে উঠে যায়। ফলে বায়ুর চাপ ব্যাপকভাবে হ্রাস  পায়। একে নিম্নচাপ বলে। এ নিম্নচাপ অঞ্চলে প্রায় বায়ুশূন্য অবস্থা থাকে বলে আশেপাশের অঞ্চল থেকে বায়ু প্রবলবেগে ঘুরতে ঘুরতে নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। এ নিম্নচাপ কেন্দ্রমুখী প্রবল ঘূর্ণি বায়ুপ্রবাহকে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন বলে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৬-২৭ ডিগ্রি থাকা আবশ্যক এবং একটি নির্দিষ্ট গভীরতা (কমপক্ষে ৫০ মিটার) পর্যন্ত এ তাপমাত্রা থাকতে হয়। বঙ্গোপসাগর অতিরিক্ত ঘূর্ণিঝড়প্রবণ হওয়ার পিছনে এর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চ তাপমাত্রাকে মূলত দায়ী করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই সাধারণত বাড়ছে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা। মে মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরের গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা আম্ফানের তীব্রতাকে আরো বেশি ঘনীভূত করে। যে কারণে গত ১৬ মে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণাংশে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ভিতর অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় বা সুপারসাইক্লোনে রূপ নেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ গবেষক ড. বিশ্বজিত্ নাথ বলেন, বঙ্গোপসাগরে বর্তমানে গড় তাপমাত্রার বৃদ্ধির হার ২.৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে পৌঁছেছে। যেটা অবশ্যই আতঙ্কের বিষয়। বঙ্গোপসাগর উপকূলে গত ৬০ বছরে প্রায় চারগুণ বেড়েছে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা। সমুদ্রের তাপমাত্রা, চাপ ও বায়ুপ্রবাহ স্বাভাবিক মাত্রা অতিক্রম করায় এ ধারা আরো বাড়বে বলে মনে করছেন জলবায়ুবিদরা। এভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে আগামী ১০০ বছরের ভিতর সুন্দরবন বঙ্গোপসাগরের নিচে তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাতহানা অতীতের বহু ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে সুন্দরবন। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে প্রতিহত করার ক্ষমতা মানুষের নেই। তাই সুন্দরবন রক্ষা, উপকূলীয় বনায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সকল দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, নতুবা বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সবচেয়ে বড়ো ক্ষতির সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়