আশঙ্কার দোলাচলের মধ্যেই আজ উঠছে লকডাউন। সাধারণ ছুটি শেষে সীমিত পরিসরে হলেও আজ থেকে ফিরে আসবে সেই চিরচেনা ব্যস্ততার জীবন। খুলে যাচ্ছে অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক-বীমা পুরোদস্তুর চালু হয়ে যাবে। সরগরম হয়ে উঠবে শেয়ারবাণিজ্য। স্কুল-কলেজ না খুললেও শপিংমল, বিপণিবিতানগুলো খুলে যাচ্ছে। তবে ট্রেন ও লঞ্চ আজ থেকে চলাচল শুরু করলেও বাস চলবে কাল থেকে। মানুষের পদচারণায় ঘরবন্দি জীবন ফিরবে স্বাভাবিক ছন্দময়তায়। মৃত্যুভয় কাটিয়ে আবার জেগে উঠবে জীবন।
কিন্তু সত্যিই কি সেই আগের রূপ ফিরে পাবে আমাদের জীবনযাপন? না। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই খুলছে সবকিছু। ফলে আমাদের চলায় বলায়, প্রতিদিনের আচরণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অদৃশ্য নিয়মে বাধা থাকবে। কেননা এই সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের মধ্যেই থাকছে করোনা সংক্রমণ থেকে নিজেকে ও অপরকে নিরাপদ রাখার উপায়।
সংক্রমণের একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছি আমরা। কিন্তু তার জন্য অনির্দিষ্টকাল লকডাউন করা সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের এই মহামারি খুব দ্রুত দূর হবে না। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকবে না। পৃথিবীর সব দেশেই করোনা সংক্রমণের মধ্যেই শিথিল হচ্ছে লকডাউন। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশকেও লকডাউন শিথিল করতে হচ্ছে। কারণ যতদিন না কোনো প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার হচ্ছে, ততদিন করোনা ভাইরাসকে সঙ্গী করেই আমাদের বাঁচতে হবে। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে জীবনযাত্রা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদের আগে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তা উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, জীবন-জীবিকার স্বার্থে চালু করতে হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বলেছেন, জীবন ও জীবিকা দুটোই বাঁচাতে হবে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে অনুযায়ী। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও গত শনিবার প্রেস ব্রিফিং-এ বলেছেন, ভাইরাস ঠেকাতে লাগাতার লকডাউন চালানো সম্ভব নয়। এর ফলে থমকে গেছে অর্থনীতি। অর্থনীতি সচল করার পথে হাঁটছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারও। আগামীকাল সোমবার থেকে লকডাউন শিথিলের পরিধি বৃদ্ধি করা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গেও। এমনিভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করোনা সংক্রমণের মধ্যেই লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর নগরী নিউ ইয়র্কেও শিথিল করা হচ্ছে লকডাউন। ইউরোপের অনেক দেশই তুল নিয়েছে লকডাউন। বাংলাদেশও সময়ের প্রয়োজনে সেই পথেই হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে।
দেশে ৬৬ দিন লকডাউন থাকার পর খুলছে বিপণিবিতান। খুলছে অফিস। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঝুঁকির মধ্যেও খুলতেই হচ্ছে। কারণ এভাবে জীবনের গতিকে বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকি জেনেও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে মার্কেট চালু করার মতো কাজটি করতে হচ্ছে।
চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মনজুরুল ইসলাম মনজু গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগামী বুধবার থেকে তারা মার্কেট চালু করবেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মার্কেটগুলো বন্ধ। যারা ঈদকে সামনে রেখে দোকানে পণ্যের সমাবেশ করেছিলেন তাদের অধিকাংশই ব্যাংক ঋণের মধ্যে রয়েছেন। বেচাকেনা না চললেও সেই ঋণ পরিশোধের একটা চিন্তা সবার মাথার মধ্যেই রয়েছে। এর পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবন চালানোর খরচ রয়েছে। দোকান কর্মচারীরাও রয়েছে আর্থিক সংকটে। এই পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকির বিষয়টি পরিষ্কার হলেও বাধ্য হয়ে দোকান খুলতে হচ্ছে আমাদের।
তবে সীমিত আকারে খুললেও হাটবাজার, দোকানপাটে বেচাকেনার সময় পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানতে হবে। শপিংমলের প্রবেশমুখে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শপিংমলে যাওয়া যানবাহনগুলোকে অবশ্যই জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। হাটবাজার, দোকানপাট ও শপিংমল বাধ্যতামূলকভাবে বিকাল ৪টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি, অসুস্থ কর্মচারী ও সন্তানসম্ভবা নারীরা কর্মস্থলে যাবেন না। জরুরি অত্যাবশ্যকীয় ক্ষেত্র ছাড়া সব সভা ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে আয়োজন করতে হবে।