আজাদ রহমানের অপ্রকাশতি জীবনস্মৃতি: আমার জীবন আমার সংগীত

নিভৃতচারী খ্যাতিমান সঙ্গীতশিল্পী আজাদ রহমান গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন হলো। ইত্তেফাক সাময়িকীতে লিখছিলেন একটি আত্মস্মৃতিমূলক ধারাবাহিক। তার কিছু অংশ থেকে যায় অপ্রকাশিত। এখানে সে স্মৃতিকথার একটি অংশ প্রকাশিত হলো-

মাঝে মাঝে হিন্দু মুসলমান রায়ট হতো। আমরা সংখ্যালঘু হওয়ায় প্রায়ই হিন্দু সম্প্রদায়ের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। এছাড়া চোর-ডাকাতের উপদ্রব ছিল। আমার শৈশবকালেই তিনবার চুরির কথা আমার খুবই মনে পড়ে। বৈঠকখানায় যাত্রার রিহার্সেল হচ্ছিল। আমার বাবা হারমোনিয়াম বাজিয়ে বাচ্চাদের নাচের রিহার্সেল করছিলেন। এ সময় চোর এসে পড়ায় পায়ে নুপুর বেঁধে নৃত্যরত অবস্থায় আমি বাইরে থেকে যাই। সকলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে যান। পরে হঠাৎ করে চোর আসার সংবাদ পেয়ে আমার মা ঘরে আমাকে না পেয়ে দরজা খুলে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে আমার খোঁজে বের হন। তারপর আমাকে পেয়ে কোলে করে ঘরে নিয়ে যান। আমাদের গ্রামে মাটির দোতালা ঘর হতো। গরমের দিনে সে ঘর ঠান্ডা, ঠান্ডার দিনে গরম। আমাদের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই ঘরগুলোতে বাস করার ভিন্ন মজা পাওয়া যেত। প্রকৃতির স্পর্শ সুখে বড়ো হওয়ার আনন্দ উপভোগ করতাম। একবার আমার নানা আমাদের বাড়িতে এসে দোতলায় বারান্দায় আমাকে নিয়ে শুয়েছিলেন। নানার সঙ্গ আমি খুব পছন্দ করতাম। তিনি শিক্ষাধর্ম নিয়ে নানা ধরনের গল্প শোনাতেন। গল্প শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। নানাকে আমার বাবার মামা মাঝে মাঝে হুকোয় তামাক খাইয়ে যেতেন। নানা নিচে লাইট দেখে বলছিলেন, বিয়াই আমাকে কি হুকো খাওয়াতে এসেছেন? তখন সম্ভবত আমার বাবা ঘরের ভেতর থেকে ডাকাত আসার বিষয়টি বুঝতে পেরে অতি দ্রুত দরজা খুলে নানা ও আমাকে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। তিনি নানাকে বলেন, চোর এসেছে চুপ করে থাকেন। সেইবার দুর্ধর্ষ সাঁওতাল ডাকাত দল আমাদের বাড়িতে হানা দিয়েছিল। সংখ্যায় ছিল তারা ত্রিশ-চল্লি¬শ জন।

সব থেকে অবাক হওয়ার মতো ঘটনা, সেদিন দুপুরে দুজন সাঁওতাল যারা দুমকা অঞ্চল থেকে এসে আমাদের বাড়িতে এক বছর আগে কাজ করে গেছে, তারা এসেছিল এবং দুপুরের খাওয়া আমার মা তাদেরকে খাইয়েছেন। আলাপ-আলোচনায় তারা জেনে গিয়েছিল আমার বাবা ঐ রাতে যাত্রায় সংগীত পরিচালনার জন্য পাশের গ্রামে যাবেন। হঠাৎ করে আমার বাবাকে সন্ধ্যাবেলা একটি কাঁকড়া বিছা কামড় দেয়। সেই যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন আমার বাবা, তিনি যাত্রায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অন্য একজন লোক পাঠিয়ে দেন এবং যাত্রা চালিয়ে নিতে বলেন। ডাকাত দল মশাল, টাঙ্গি, বর্শা, কুড়াল নিয়ে আমাদের মানুষের উপর অত্যাচার চালায় এবং ঘরের দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। যেহেতু পাশের গ্রামে যাত্রা হচ্ছিল, আমাদের গ্রামের বেশ কিছু মানুষ যাত্রা দেখতে গিয়েছিলেন, বহু লোকের সমাগম ঘটেছিল। আমাদের গ্রামের এক ব্যক্তি যাত্রার আসরে গিয়ে খবর দেন ডাকাত পড়েছে। এ খবর পেয়ে আমাদের আত্মীয়স্বজন ও অনেক শ্রোতা-দর্শক এসে আমাদের বাড়ির ডাকাত দলের মুখোমুখি দাঁড়ান। ধারালো অস্ত্র ও লাঠি হাতে ডাকাতদের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আমার সম্পর্কীয় চাচা একজন ডাকাতকে বর্শা দিয়ে গেঁথে ফেলেন। ডাকাতের হাত কেটে ফেলেন আরেক চাচা। এভাবে খণ্ডযুদ্ধের এক পর্যায়ে আমাদের অনেক সম্পদ নিয়ে ডাকাত দল পালিয়ে যায়। আমাদের বাড়িতে একজন ডাকাত মারা গিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে হাত কাটা ডাকাতসহ কয়েকজন ডাকাত ধরা পড়লেও লুট হয়ে যাওয়া অর্থ সম্পদ আর ফেরত পাওয়া যায়নি।

একবার হিন্দু মুসলমান রায়টের কথা খুবই মনে পড়ে। তখন আমি অতি বাচ্চা। বয়স কম হলেও অমানবিক সেই ঘটনা এবং পশুসুলভ উম্মত্ততা আমার মনে এমনই দাগ কেটে বসে গেছে, যা আমি পরিষ্কার দেখতে পাই। পাশের গ্রাম থেকে দুষ্ট প্রকৃতির সংখ্যাগুরু হিন্দুরা আমাদের গ্রামে হানা দেয়। প্রচণ্ড শীতে আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেশকিছু দুরে আমার মা চাষের জমির পাশে নালার পানিতে আমার গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখেন এবং বলেন চিৎকার করলে মারা পড়বি। এই অমানবিক পশুবৃত্তি, মানুষে মানুষে ভেদাভেদের হিংস্রতা, মানুষ খুনের মত্ততা মনে পড়লে এখনো আমি শিউরে উঠি।

হিন্দু-মুসলমানের এই ধর্মান্ধতা স্বার্থ উন্মত্ততায় এই উপমহাদেশ খণ্ড বিখণ্ড হয়েছে। ব্যক্তির ন্যায্য পাওনা, ন্যায়নীতি যোগ্যতার মূল্যায়ন, মানবিকতা, আইন-শৃঙ্খলা সবকিছু ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে। আমাদের অনেক সুচিন্তা-সাফল্যকে অহেতুক ধর্মান্ধতায় মলিন করেছে, মানুষ ছুটে বেড়িয়েছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। জন্মস্থান নাড়ির টান ছিন্ন হয়েছে স্বার্থের সংঘাতে...। অবিভক্ত বিশাল ভারতবর্ষ দুই দেশে বিভক্ত ভারত, পাকিস্তান হয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি। ধর্মভিত্তিক দেশ পাকিস্তান দুই খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশ জন্মলাভ করেছে। এত কিছুর পরেও ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল মানুষ কি তাদের ন্যায্য পাওনা পেয়েছে বা পাচ্ছে? পাশাপাশি দেশগুলি একে অপরকে দোষারোপ করলেও এর দায় সবাইকে নিতে হবে। তবে ক্ষমতাবান বড়ো দেশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের মানুষের প্রতি আনুপাতিক হারে দায়িত্বটা বেশি বর্তাবার কথা। দায়-দায়িত্ব স্বীকার করি আর না করি এই ভয়াবহ পশুত্ব থেকে কোনো ব্যক্তিরই নিষ্কৃতি নেই। এই অন্ধত্ব নিরসনের কেউ চেষ্টা করেননি এমন কথা বলা যাবে না। তবে স্বার্থান্বেষী ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা এই হিংসা এবং দ্বন্দ্বের আগুনে যে ঘি ঢেলেছেন তার ভুড়ি ভুড়ি প্রমাণ এ অঞ্চলের ইতিহাস প্রমাণ দেয়। সারা পৃথিবীতেই ধর্ম-জাতি-গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং তা কাটিয়ে ওঠার প্রবণতাও পরিলক্ষিত হয়। এটাই একমাত্র শুভদিনের স্বপ্নের উপজীব্য। আমাদের বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধ এইসব শুভ স্বপ্নের আকাক্ষায় বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। তাই আকাক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সকলকে সচেতনতার সঙ্গে সচেষ্ট থাকতে হবে। তবে ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ এবং দলীয় স্বার্থে আবদ্ধ হয়ে কিছুই হবে না। সব মানুষের মঙ্গলের জন্য লোভ-লালসার সীমানা নির্ধারণ করতে হবে, নিয়ন্ত্রিত করতে হবে নিজেকে, যাতে কারো সঙ্গে কারো এ নিয়ে বিবাদ না বাধে। একের বাঁচার অন্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে। একজনের ঘরবাড়ি আরেকজন দখল না করে। ক্ষমতায় বসে কেউ সবকিছু গ্রাস করতে না পারে। ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এটা বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব প্রথমত সরকারের। তবে সামাজিক দায়-দায়িত্ব কম নয়। আমাদের সবাইকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাজনৈতিক জয়টাই যদি শেষ কথা হতো তাহলে অবিভক্ত ভারতবর্ষ ভাঙত না। প্রতিশোধ স্পৃহা স্বার্থলোভী মনোভাব ত্যাগ করাটাই সব থেকে বড়ো কথা।