টিকিয়া থাকাটাই এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ

করোনা ভাইরাস ব্যাপক বিস্তারের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখন বড়ো ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। আশঙ্কা করা হইতেছে, এই প্রভাব সবচাইতে মারাত্মক আকার ধারণ করিবে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশগুলিতে। আমাদের জিডিপি প্রায় ৩২০ বিলিয়ন ডলারের এবং সেইখানে শিল্পের অবদান প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু করোনার কারণে তিন মাস ধরিয়া সেই শিল্পের ৯৫ শতাংশই বন্ধ রহিয়াছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী পোশাক রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স—এই দুইটির সম্মিলিত অবদান বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ১৮ শতাংশ। আর এই অবদান নিবিড়ভাবে জড়িত পশ্চিমা অর্থনীতির সহিত। সেইখানে মহামন্দা দেখা দেওয়াই তাহার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশেও পড়িতে শুরু করিয়াছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে আশঙ্কা করা হইতেছে, করোনার অভিঘাতে যেই মহামন্দা শুরু হইয়াছে সেইখান হইতে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া আসিতে প্রায় ১০ বত্সর লাগিবে! বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এমন ভয়াবহ বিপদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে আগে কখনো আসে নাই।

সময়টা অস্বাভাবিক, তাই ইহার তাত্ক্ষণিক অভিঘাতে ছিন্নভিন্ন হইয়াছে অর্থনীতির অনেকগুলি যোগসূত্র। এই কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করিয়াছে। যেহেতু আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স—উভয় ক্ষেত্রেই সবচাইতে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত, সেই কারণে এই খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের চাহিদাও ফিরিয়া আসিতে সময় লাগিবে। এমনকি যেই সকল দেশে বর্তমানে বাংলাদেশি কাজ করিতেছেন তাহাদের অনেকেই করোনা-পরবর্তীকালে ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইবেন। কারণ সেইখানেও শ্রমিক ছাঁটাই হইবে। তাহা ছাড়া ১৪ লক্ষেরও অধিক প্রবাসী শ্রমিক চাকুরি হারাইয়া দেশে ফিরিয়া আসিয়াছেন। ইতিমধ্যে যাহারা কাজ থাকা সত্ত্বেও কেবল করোনার কারণে সাময়িকভাবে ফিরিয়া আসিয়াছেন, তাহাদেরও বড়ো একটি অংশ পুনরায় প্রবাসে কাজে ফিরিতে পারিবেন না। বিদেশে থাকা অভিবাসীদের একটি অংশ এখন ঋণচক্র ও সামাজিক কলঙ্কের শিকার হইবার ঝুঁকিতে রহিয়াছেন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়িয়াছেন। এই যখন অবস্থা, তখন বেসরকারি তিনটি সংস্থার যৌথ সমীক্ষায় বেশ আশঙ্কাজনক তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে। সমীক্ষায় বলা হইয়াছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশের ১০ কোটি ২২ লক্ষ মানুষ অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত দুর্বলতার ঝুঁকিতে পড়িয়াছেন। অর্থাত্ দেশের প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবারের উপার্জন কমিয়া গিয়াছে। ইহার সহিত নিম্ন আয়ের মানুষের উপর বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়িয়াছে। দেখা গিয়াছে, গড়ে তিনটি পরিবারের অন্তত একজন করিয়া ব্যক্তি চাকুরি হারাইয়াছেন। সকলের চাইতে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছেন দিনমজুরসহ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরতরা। আরেকটি দুশ্চিন্তার বিষয় হইল, দেশের প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লক্ষ মানুষ উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রহিয়াছেন। কোভিড-১৯ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং তাহাদের পরিবারগুলিকে আরো বেশি বিপদের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে।

অবস্থা এমন যে, মানুষকে আগে বাঁচিতে হইবে, তাহার পর স্বপ্নপূরণ আর সুখে থাকিবার চিন্তা। টিকিয়া থাকাটাই এখন সবচাইতে বড়ো চ্যালেঞ্জ। সুতরাং আগামী সকল পরিকল্পনা সাজাইতে হইবে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করিবার কার্যকরী পন্থা হিসাবে।