করোনার অভিঘাতের দুটো ধারা—একটা হচ্ছে তাত্ক্ষণিক জীবনের ওপরে, আরেকটি জীবনযাত্রার ওপর করোনার প্রতিক্রিয়াসমূহ। এখানে প্রায়ই একটি মিথ্যা কূটতর্ক করা হয়। আমরা জীবন রক্ষা করব, না জীবিকা রক্ষা করব? আমরা ভুলে যাই যেটা অভিজিত্ ব্যানার্জি, কৌশিক বসু ও অমর্ত্য সেন সবাই বলেছেন যে জীবন রক্ষা করতে গিয়ে যদি আমরা সাধারণ দরিদ্র মানুষদের জীবিকা বন্ধ করে দিই, তাহলে শেষ পর্যন্ত জীবনও রক্ষা পাবে না, জীবিকাও রক্ষা পাবে না। তাই common sense বলে, আমাদের জীবনও রক্ষা করতে হবে, জীবিকাও রক্ষা করতে হবে। তবে কোনটা কখন কতটুকু অগ্রাধিকার পাবে তা নির্ভর করবে নিজ নিজ দেশের গণমানসিকতার (মানুষ কতখানি বেপরোয়া বা কতখানি সুশৃঙ্খল ইত্যাদি!) ওপর এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের দূরদর্শী ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর। আমাদের দেশে করোনা সংকট মোকাবিলায় দুই দিক থেকেই ঘাটতি রয়েছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে অনেকগুলো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আমরা জানি, করোনা ভাইরাস এদেশে এসেছিল ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে; করোনা রোগী প্রথম আবিষ্কৃত হয় ৮ মার্চ। তখন এটা ছড়ায়নি। তখন যদি বিদেশপ্রত্যাগতদের কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে ছড়ানোর সুযোগ কমে যেত। তাহলে আমরা Vietnam/ Nepal/ Kerala-র মতো অল্প দিনের মধ্যেই coronaকে মোকাবিলা করে দাঁড়িয়ে যেতে পারতাম বলে মনে হয়। তবে মনে হয়, এর ভয়াবহতা নিয়ে প্রথম দিকে আমাদের কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। যা-ই হোক, যখন আমরা বুঝলাম যে এটা ভয়াবহভাবে ছড়াতে পারে তখন আমরা গণপরিবহন বন্ধ, দোকানপাট বন্ধ, অফিস আদালত ছুটি, কলকারখানা বন্ধ, অর্থাত্ প্রায় total lock down-এর নির্দেশ দিলাম, যদিও তা সবাই সমানভাবে মেনে চলেনি। Lock Down আমরা করলাম, কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা হতে পারে না। আপনাকে আজ হোক কাল হোক, তা ওঠাতে হবেই।
বাধ্যতামূলক লকডাউনের ফলে বহু লোক বেকার হয়ে গেল। আমাদের ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান Informal Sector-এ তারা দিন আনে দিন খায়। তারা বেকার হওয়া মানে আয়হীন হওয়া। আমরা এজন্য প্রথমদিকে দেখেছি রিকশাওয়ালা lock down মানছে না। আবার গাড়িওয়ালারা তাদের খাবার দিচ্ছে—এ ধরনের মানবিক আচরণও আমরা দেখেছি। Municipal Ward-এ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শহরের এলাকার স্থানীয় দরিদ্রদের কিছু খাবার দিয়েছে—NID দেখে। OMS-এ সস্তায় বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কম দামে বিক্রি করেছেন। যদিও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় কম।
কর্মহীন-আয়হীন লোকেরা প্রধানত দুটো পন্থায় জীবন নির্বাহ করেছে—ক) এরা গ্রামে চলে গেছে, ফলে আবার অন্যদিকে Pandemic দেশব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। খ) এরা অনেকেই আবার ধার করে চালিয়েছেন। কেউ কেউ সরকারি ত্রাণ ও সম্পন্ন মানুষদের দয়া-দাক্ষিণ্য দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।
একটা জিনিস পরিষ্কার বাংলাদেশে যে ২০ শতাংশ দরিদ্র লোক আছে বলা হয়, তার সঙ্গে আরো ২০ শতাংশ নতুন বেকার যোগ হলে ৪০ শতাংশ বা ৬-৭ কোটি লোক খাদ্যসংকটে পড়ার কথা। এদেরকে অন্তবর্তীকালীন খাদ্যসাহায্য দিতে হতো। এখনো সে প্রয়োজন অনেকের জন্যই ফুরিয়ে যায়নি। তবে সত্যিকার প্রয়োজন কাদের তা শনাক্ত করতে হবে।
এক্ষেত্রে তিনটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে— ক) শনাক্তকরণ, তালিকা প্রণয়ন ও নবায়নের কোন System নেই। খ) অ্যাডহক ভিত্তিতে চেষ্টা চলছে—তাতে নিখুঁত data base না থাকায় overlapping হয়েছে ও স্বজন/দলপ্রীতির কারণে যার পাওয়ার কথা নয় সে পেয়ে যাচ্ছে। গ) অপর্যাপ্ত বরাদ্দ হয়েছে এবং দেরিতে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। ফলে যথার্থ প্রাপকরাও পাচ্ছেন না।
সমাধান :ক) কেউ কেউ বলছেন, করোনা শিখিয়ে দিয়ে গেল দরিদ্রদের জন্য ভারতের অনুরূপ ‘আধার’ card তৈরি এবং তাকে নিয়মিতকরণের জন্য এখন কাজ শুরু করতে হবে। খ) একটি ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। গ) বাজেটে নমনীয়তা থাকতে হবে যাতে দ্রুত সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা যায়।
একটা বিতর্ক আছে cash না kind। তবে cash-এর পক্ষেই বেশি মত। তাতে অনেকগুলি লাভ—Cash বণ্টনে দুর্নীতি কমে যাবে, দ্রুত সরাসরি দেওয়া যাবে এবং প্রাপকের ব্যয়সংক্রান্ত choice থাকবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেজন্য সরকারের হাতে এসব পণ্যের ২০ শতাংশ মজুত থাকতে হবে, যাতে syndicate চেষ্টা করলেও OMS দ্বারা তা ঠেকানো যাবে। যথেষ্ট খাদ্যশস্য সরকারিভাবে সংগ্রহ ও কেনার জন্য যথেষ্টসংখ্যক গুদাম তৈরি করা দরকার এবং যথাসময়ে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। যেমন : ১। ভরা মৌসুমে ফসল কিনবে ও হালকা মৌসুমে ছাড়বে। ২। চাহিদা হিসাব করে প্রয়োজনমতো আমদানি করা। ৩। E-Marketing-এর ব্যবস্থা করলে ভোক্তা ও বিক্রেতা উভয়ই সুবিধা পাবে।
তবে বামপন্থিরা মনে করেন, সবচেয়ে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা হতে পারে সর্বজনীন রেশন অর্থাত্ চাল/ডাল/তেল/লবণ/আটা রেশনের মাধ্যমে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নির্বাচিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দিলে ভালো হয়। এখন রেশন চালু আছে কিন্তু তার কোনো সুবিবেচিত মানদণ্ড নেই।
আমরা সর্বশেষে দেখছি, সরকার Lock Down আপাতত উঠিয়ে নিচ্ছেন। তাদের ধারণা আগামী ১৫ দিনে যদি সংক্রমণ হার তেমন না বাড়ে তাহলে বুঝতে হবে যে Herd Immunity Strategy বাংলাদেশে কাজ করবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো খোলা হয়নি। আগামী দুই সপ্তাহ একটা ভয়ংকর অনিশ্চিত অবস্থা।
এই পরিস্থিতিতে আমরা যদি প্রশ্ন করি যে অর্থনীতির বা জীবিকার যে বৃহত্ ক্ষতিগুলো ইতিমধ্যেই হয়েছে সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো কী? আগামী এক থেকে দুই বছরে মধ্যমেয়াদে সরকার এগুলো থেকে উদ্ধারের জন্য কী করতে পারে? এবং মধ্যমেয়াদে নিট ফলাফল কী দাঁড়াতে পারে? এটাকে আমরা বলব মধ্যমেয়াদি অভিঘাতের পর্যালোচনা। আমি এ বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরছি— ১। প্রথমে পরিবহন ও বাজারের গতি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার চালু ছিল। Corona Crisis আধুনিক খাত ও আন্তর্জাতিক খাতকেও আঘাত করেছে। ২) স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে। Private Sector চিকিত্সাই দিতে চাইছে না। ৩) পর্যটন/ অ্যাভিয়েশন বন্ধ হয়ে গেছে। ৪) রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে পোশাকশিল্প থমকে দাঁড়িয়েছে। ৫) ক্ষুদ্র/মাঝারি/বৃহত্ শিল্প থমকে দাঁড়িয়েছে। ৬) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ৭) ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে গেছে।
আমরা দেখলাম প্রধানমন্ত্রী মোটামুটি দ্রুতই এখানে চারটি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন :১। মন্দা fight করার জন্য সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি। ২। ক্ষতিগ্রস্ত বৃহত্, ক্ষুদ্র, মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য উদার আর্থিক ঋণের প্যাকেজ। যাকে ‘প্রণোদোনা’ বলা হচ্ছে। ৩। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রসার। ৪। মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি।
উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি হিসেবে এগুলো অর্থনীতিবিদরা মোটামুটি ঠিক বলে মত দিয়েছেন, তবে এখানে অগ্রাধিকার নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাদের মতভেদ রয়েছে। তদুপরি এগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি আছে। উত্তরাধিকার সূত্রে কাঠামোগত ঘাটতিগুলো প্রাপ্ত। মধ্যমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদে এগুলো সারাতে হবে। কিন্তু কতটুকু হবে তা নির্ভর করবে মূলত সরকারের ঘোষিত নীতি বাস্তবায়ন অঙ্গীকার মাত্রার ওপর। আমাদের structural weakness-এর কয়েকটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো। যেমন— ১। স্বাস্থ্য বাজেট বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার (South Asia) মধ্যে সর্বনিম্ন (lowest) এটা চলতি বাজেটে—মোট প্রস্তাবিত ব্যয়ের ৫ শতাংশের কম। GDP-র ১ শতাংশের কম। ২। Garments Sector-এ রয়েছে প্রচণ্ড সমন্বয়হীনতা। তাই যে ৫ হাজার কোটি টাকা শ্রমিকদের বেতন বাবদ ২ শতাংশ Service charge দেওয়ার কথা ছিল তা ঠিকমতো ব্যয় হয়নি—ক) অনেক কারখানায় ৬০ শতাংশ বেতন দেওয়া হয় এপ্রিল মাসে। খ) Lock Down মাঝপথে ভাঙা হয়। গ) এখন প্রায় ৪ লাখ শ্রমিক ছাঁটাই হবে বলে শ্রমিকদের মধ্যে আশঙ্কা। স্বাস্থ্যনিরাপত্তাহীনতা ও চাকরি নিরাপত্তাহীনতা দুই আশঙ্কাই শ্রমিকদের মধ্যে বিরাজ করছে। ৩। প্রবাসীদের Remittance ঘাটতি এখনো শুরু হয়নি। এবার ঈদে আগের ঈদের তুলনায় বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। তবে শিগিগরই এখানে ঘাটতি শুরু হবে। প্রায় ১০ লক্ষ প্রবাসী চাকরি হারিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। ৪। তবে কৃষিতে ফসল ভালো হয়েছে, কিন্তু সেখানে শ্রমিকসংকট ছিল, তাতে যারা গ্রামে গেছে, তারা কেউ কেউ কাজ করে আয় পেয়েছে, আর এর পরও কোথাও কোথাও শ্রমিকসংকট থাকায় Harvester কাজে লাগানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে আমি বলব, আমাদের আগামী বাজেটে করোনাপ্রসূত দুর্বলতাকে দূর করার জন্য যে বিশেষ ও বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে তা হচ্ছে—স্বাস্থ্যব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন, দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, আর্থিক সুশাসন, কৃষিশিল্পের বহুমুখীকরণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ। তবে এখনো আমাদের দুটি শক্তির দিক আছে—সেগুলি হচ্ছে, কৃষির শক্তি ও প্রবাসীদের শক্তি। আগামী বাজেটে ঐ চারটি দুর্বলতা কাটানো হচ্ছে একটি চ্যালেঞ্জ এবং ঐ দুটি শক্তি সংহত করা হচ্ছে আরেকটি চ্যালেঞ্জ।
n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক,
অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়