ড. মো. নাজমুল কবির চৌধুরী
যেহেতু আমি শিক্ষক, তাই এ মুহূর্তে দেশের সব শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন নিয়েই উদ্বিগ্ন। দায়িত্বশীলদের অনেকেই বলছেন, এ মহামারিতে শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে সংকটকালে শিক্ষার্থীদের মন শিক্ষাগ্রহণে অনুপযোগী; তাই তারা মূল শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। বরং আমার মনে হয়, সংকটময় এ পরিস্থিতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা উচিত। সৃষ্ট করোনা ভাইরাস রোগসমূহ ভাইরাস বাহিত; এর কোনো টিকা বা সুনির্দিষ্ট ওষুধ চিকিত্সাবিজ্ঞান এখন পর্যন্ত আমাদের হাতে তুলে দিতে পারেনি। আমরা কি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছি কখন এ মহামারি বিশ্ব থেকে বিদায় নেবে? তাহলে বলতেই হয়, আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন কি আমাদের চোখের সামনেই স্থবির হয়ে থাকবে? এ ভাইরাসের কাছেই সমাজের বিবেকবান গোষ্ঠী ও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে আত্মসমর্পণ করবে? না, না না! এটা বিশ্বাস করি না। সে কারণেই দেশ-বিদেশে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা অনলাইনেই মূল শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। উল্লেখ্য, বিবিসি জানাল বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যখন টিউশন ফি ফেরতের আবেদন করছে তখন কর্তৃপক্ষ তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ফি ফেরত দেওয়া হবে না বরং অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চলবে। ভাবতে ভালো লাগছে যে, বাংলাদেশেও এরূপ কার্যক্রম চলছে; যেমন, আমার কর্মরত প্রতিষ্ঠান ও আমার ছেলের স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এমনকি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে ১ জুন ২০২০ থেকে অনলাইনে পরীক্ষায়ও বসছে। সরকার সংসদ টিভির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থা করেছে। তাই সরকার ও অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থা গ্রহণকারী সব কর্তৃপক্ষের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ। এ লেখার একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো—এ মুহূর্তে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে কেন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা উচিত তা উল্লেখ করা :
১. করোনা মহামারি এবারই শেষ নাও হতে পারে, ভবিষ্যতে প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে ঠিক কত মাস এভাবে করোনা বা অন্য কোনো নতুন ভাইরাস মহামারির কারণে আমরা শিক্ষার্থীদের স্থবির থাকার পরামর্শ দেব? তাই আজ অথবা কাল সরাসরি পাঠদানের বিকল্প ভাবতেই হবে এবং সেক্ষেত্রে অনলাইনে পাঠদান একটি সুন্দর বিকল্প। ২. শিক্ষাবিদদের অনেকেই বলছেন, সরাসরি পাঠদানের কোনো বিকল্প নেই। এ বিবৃতির সঙ্গে আমি আংশিক একমত; আমরা মহামারির সময় পার করছি; সরাসরি পাঠদান এখন অসম্ভব। তাই এ মুহূর্তে স্লোগান হওয়া উচিত অনলাইনে পাঠদানই হচ্ছে সর্বোত্তম পদ্ধতি। কারণ এ পদ্ধতি সর্বদাই প্রযোজ্য। ৩. বাংলাদেশে অনলাইনে পাঠদানে অধিকতর অনুশীলন করা কৌশল হলো একজন শিক্ষক নিজে একটি লেকচার দেন, তা ভিডিও করে টিভিতে প্রচার বা ইউটিউবে আপলোড করা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপকার হচ্ছে কোনো সন্দেহ নেই, তবে এটি একমুখী অর্থাত্ শুধু শিক্ষককেন্দ্রিক। আমি মনে করি, এর থেকে উত্তম বা শিক্ষার্থীদের অধিকতর মনোযোগ আকর্ষণকারী কৌশলকে আমরা উপেক্ষা করছি। যেমন, জুম (zoom)-এ পাঠদানে ১০০ জন অংশগ্রহণকারী বিনা খরচে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক ক্লাস নিশ্চিত করতে পারে। সম্মানিত শিক্ষকরা, যারা সর্বদা প্রকৃত ক্লাসের স্বাদ খোঁজেন তাদের জন্য এটি উত্তম মাধ্যম। zoom-এ ক্লাস স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অডিও এবং ভিডিওসহ রেকর্ড হয়ে যায়। এ রেকর্ডগুলো টিভিতে প্রচার/ইউটিউবে আপলোড করলে শিক্ষার্থীরা অধিকতর উপকৃত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
৪. যারা অদ্যাবধি কোনো প্রকার পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন না, তাদের উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে বলছি, অনলাইনে পাঠদানের ফলে কারো কোনো প্রকার ক্ষতি তো হবে না বরং উপকার আর উপকারই দেখতে পাচ্ছি। আমরা যদি এভাবে ভাবি যে, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সম্মানিত শিক্ষকরা যদি করোনাকালে রসায়নের অপেক্ষাকৃত জটিল টপিকগুলো zoom-এ পাঠদানের ব্যবস্থা করেন, পরবর্তী সময়ে ঐ ক্লাসের ভিডিও ক্লিপগুলো দেখার মাধ্যমে সারাদেশের ছাত্রছাত্রী উপকৃত হয়, তাহলে এটি হতে পারে এ সময়ের জন্য এক বিরাট চ্যারিটি। এছাড়াও যে মহালাভ, তা হলো দেশের সব কটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্নাতকোত্তর কলেজগুলোর রসায়নের শিক্ষক মহোদয়েরা যদি সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ে রসায়নের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত টপিকগুলো উল্লিখিতভাবে সারাদেশের ছাত্রদের কাছে তুলে দিতে পারেন, তাহলে এ বিশাল অনলাইন শিক্ষাভান্ডার ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের রসায়ন শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসবে। নিঃসন্দেহে এ বিশাল চ্যারিটির সঙ্গে জড়িত সবাইকেই আজীবন প্রতিদান দেবেন সৃষ্টিকর্তা। অন্য সব বিষয়ের জন্যও একই বর্ণনা প্রযোজ্য।
বিজ্ঞান যেমন করোনা ভাইরাস রোগের টিকা বা সুনির্দিষ্ট ওষুধ এ পর্যন্ত আমাদের হাতে তুলে দিতে পারেনি, একইভাবে এখনো সমর্থ হয়নি শিক্ষার্থীদের পেছনের সময়কে ফেরত দিতে। তাই কার্যকর অনলাইন ক্লাস-পরীক্ষা ও জ্ঞানভান্ডার তৈরির মাধ্যমে দুর্যোগ এবং স্বাভাবিক কালসহ সব সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমেই আমরা এগিয়ে যাব এবং পাব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।
n লেখক :অধ্যাপক ও ন্যানো প্রযুক্তি গবেষক,
রসায়ন বিভাগ, ঢাকা কলেজ