বত্সরের ৩৬৫ দিনের প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বব্যাপী উদ্যাপনের জন্য কোনো না কোনো দিবস রহিয়াছে। তবে ইহার মধ্যে কিছু কিছু দিবস রহিয়াছে, যাহার গুরুত্ব সীমাহীন। আজকের ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ তেমনই একটি দিন। ইহার গুরুত্ব বুঝাইতে মহাকবি কালিদাসের শৈশবের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাইতে পারে। কথিত আছে, ছোটোবেলায় কালিদাস নাকি নির্বোধ ছিলেন! তাহার উপর একদিন দায়িত্ব পড়িল একটি বড়ো বৃৃক্ষের কিছু ডাল কাটিবার। তিনি সানন্দে সেই ডাল কাটা শুরু করিলেন ঐ ডালটির অগ্রভাগে বসিয়া। অতঃপর ডালটি যখন সম্পূর্ণ কর্তিত হইল, তখন তিনি হুড়মুড়াইয়া ধরণীতল হইলেন!
এই বিশ্বকে নূতন একটি উন্নয়নের চেহারা দিতে আঠারো শতকে শুরু হইয়াছিল শিল্পবিপ্লব। তাহার পর যত দিন যাইতেছে, ততই মানুষ কালিদাসের মতো পরিবেশের অগ্রভাগে বসিয়া উহা কর্তন করিয়াই চলিতেছে। অবস্থা যখন ক্রমশ খারাপ হইতে থাকিল তখন গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে সংবিত্ ফিরিল বিশ্বনেতাদের। সেই বত্সর পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়টি প্রথম উঠিয়া আসে জাতিসংঘের পরিবেশসংক্রান্ত সভায়। সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৩ হইতে প্রথমবার ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসাবে পালিত হয়। ১৯৭৪ সালে ‘মাত্র একটিই পৃথিবী’ স্লোগানের উপর ভিত্তি করিয়া দিনটি উদ্যাপিত হইয়াছিল। তাহার পর ৪৫টি বত্সর পার হইয়া গিয়াছে। এইবার বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯-এর কারণে পরিবেশের বিষয়টি নূতন করিয়া সমগ্র বিশ্বের সমস্ত সচেতন নাগরিকের নজরে পড়িয়াছে। ‘মাত্র একটিই পৃথিবী’ হইতে ‘প্রকৃতির দিকে নজর দেওয়ার সময় আসিয়াছে’ স্লোগানের সময়পর্বে আমরা দেখিয়াছি এখনো এই বিশ্ব কালিদাসের মতোই নির্বোধ রহিয়া গিয়াছে। পরিবেশকে রক্ষা করাটা বিশ্বের বহু প্রান্তে এখনো কেবল স্লোগাননির্ভর হইয়া রহিয়াছে। অথচ জাতিসংঘের পরিবেশ প্রোগ্রামের হিসাবমতে, পৃথিবীর ৯২ শতাংশ মানুষ এখন নিশ্বাস লয় দূষিত বাতাসে। পরিবেশবিদদের মতে ২০৩০ সাল নাগাদ গ্রাউন্ড লেভেলে ওজোনদূষণের কারণে শস্যের পরিমাণ কমিয়া যাইতে পারে ২৬ শতাংশ! অন্যদিকে, দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, পৃথিবীর সবচাইতে দূষিত কয়েকটি শহরের মধ্যে একদম প্রথম দিকে রহিয়াছে আমাদের ঢাকা।
পরিবেশ এমনই একটি বিষয় যাহার পরিবর্তন রাতারাতি আসে না, আনা সম্ভবও নহে। আমরা যদি ‘কোয়ালিটি অব লাইফ’ বলিতে নির্মল বাতাস ও পানির কথা না ভাবি, তাহা হইলে সেই উন্নয়ন সার্থক হইবে কী করিয়া? এই বত্সর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ভাবনায় আসিয়াছে বিশ্বের জীববৈচিত্র্য। এখন প্রাথমিক স্কুলেরও একটি সচেতন শিক্ষার্থী জানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্র্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ুর পরিবর্তন, দূষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা এবং পৌষ্টিক উপাদানগুলি সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করিয়া তোলায় গোটা বাস্তুতন্ত্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাটা ভীষণ জরুরি। অথচ বিশ্বের মোট জীববৈচিত্র্যের প্রায় ৯৮ শতাংশই কিনা বিলুপ্তির মুখে! করোনার লকডাউন-পর্বে এই বিশ্বের মানুষ দেখিয়াছে, মানুষের কর্মকাণ্ড ন্যূনতম হইয়া গেলে প্রকৃতি ও পরিবেশ কীভাবে সজীব হইয়া উঠে! এই শিক্ষা যেন আমরা করোনা-উত্তর পর্বে ভুলিয়া না যাই।