বাজেট ২০২০-২০২১

করোনার মধ্যেও লক্ষ্য থেকে পিছু হটা নয়

সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য নিয়েই নানা পদক্ষেপ থাকছে নতুন অর্থবছরের বাজেটে। করোনার মধ্যেও লক্ষ্য থেকে পিছু হটছেন না অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি একাগ্র। যদিও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ থাকছে তার সামনে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন প্রত্যাশিত না হলেও সামনের দিনগুলো নিয়ে আশাবাদ রাখতে চান তিনি। করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে নানা ফিরিস্তিও থাকছে তার বাজেট বক্তৃতায়। তবে বিশ্বমন্দা আর করোনার প্রভাব সর্বত্রই যে স্থবিরতা এনে দিয়েছে, তাতে গতি আনতেই ২০২৩ সাল লেগে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে নতুন করে দারিদ্র্য বাড়বে। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। আয় দারিদ্র্য রেখার নিচে নেমে যাবে নতুন করে ৩ কোটি মানুষ। তাতে বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রেখে অর্থনীতিকে টেনে তোলা কতোটা সম্ভব হবে—সে প্রশ্নও রেখেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, নতুন বছরের বাজেটে শুধু আকার বাড়িয়ে লাভ নেই। সংকট উত্তরণের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য একটি বাজেট দরকার। গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে চাহিদার নিরিখে একটি বাজেট দিতে পারলে এবং তা বাস্তবায়ন করা গেলে করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠা দ্রুত সম্ভব হবে।

অর্থনীতির সূচকগুলো দেখলে বোঝা যায়, রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নসহ সব খাতেই করোনার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়া ও চাকরিচ্যুতির শঙ্কা কাজ করছে বেসরকারি কর্মীদের। সীমিত আয়ের মানুষ সামান্য সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী ১১ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।সূত্র জানায়, নতুন বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকার মতো। তবে শেষ মুহূর্তে এ আকারের কিছুটা হ্রাসবৃদ্ধি হতে পারে। এবারে বাজেট প্রস্তুতিকালে সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য খাতের বিষয়টি বিশেষ নজরে রাখা হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে ভর্তুকি বাড়িয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। করোনার কারণে স্বাস্থ্য পরিষেবাসহ শিল্প উত্পাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, সেবা খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব খাতের উন্নয়নে পদক্ষেপ থাকবে। করোনায় ভোগ ও বিনিয়োগ চাহিদা কমে যাওয়ায় এটি বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। ভোগব্যয় বাড়লে বছরশেষে প্রবৃদ্ধির অঙ্কও বাড়বে। রাজস্ব খাতেও কিছুটা সংস্কার, নমনীয় থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। করপোরেট কর হার হ্রাস, ব্যক্তিশ্রেণির কর সীমা বৃদ্ধিসহ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকতে পারে। তবে উন্নয়ন বাজেটের আকার খুব বেশি বাড়ছে না। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এরই মধ্যে তা সংশোধন করে ২০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। বরাবরই বাজেটের একটি বড়ো অংশ জুড়ে থাকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। করোনার প্রভাবে এডিপির আকারও খুব একটা বড়ো হচ্ছে না। এদিকে রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় বাড়বে বাজেট ঘাটতিও। ঘাটতি মেটাতে ঋণনির্ভর হতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উত্স থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমেই ঘাটতি অর্থায়ন মেটাতে হবে।

বাজেট ঘাটতি

বরাবরের মতো বাজেট ঘাটতি এবার আর মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশের মধ্যে থাকছে না। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। কিন্তু করোনার প্রভাবে বাজেট ঘাটতি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে টাকার অঙ্কে ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা বাজেট ঘাটতি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে তা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।

রাজস্ব আদায়

করোনা পরিস্থিতিতে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে যাচ্ছে সরকার। প্রতিবছরই বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়, পরে আবার সংশোধন করে কমিয়ে আনা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থবছর রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা আসতে পারে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার। এদিকে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হচ্ছে না। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়েছিল। এনবিআরের এক হিসাবে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে তা হতে পারে বড়োজোর ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে আদায়ের পরিমাণ ১ লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা কম হবে। অর্থাত্ এবার সরকারকে আগের চেয়ে বেশি ধার করে চলতে হবে।

২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার এডিপি

এরই মধ্যে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। ১৯ মে ভার্চুয়াল বৈঠকে এর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাজেট উপস্থাপনের আগে প্রতিবছর এডিপির আকার চূড়ান্ত করা হয়। এবার মূল এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরো ৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে এডিপির আকার দাঁড়াল ২ লাখ ১৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। সেই হিসেবে আগামী এডিপির মূল আকার বাড়ছে মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। করোনার কারণে এবার এডিপির আকার প্রতিবারের মতো বাড়ানো হচ্ছে না। তবে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ১০ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩ হাজার ২২৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া চলতি অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর কৃষি খাতে বরাদ্দ ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পরিবহন খাত। এ খাতে মোট বরাদ্দ ৫২ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা। এডিপির ২৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে এ খাতটি। এরপরে ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ন খাত ২৫ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। তৃতীয় স্থানে থাকা বিদ্যুত্ খাতে ২৪ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাত রয়েছে সাত নম্বরে। কৃষি খাত অষ্টম স্থানে।