আলি জামান
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পর বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। অনেক দেশে বিদ্যমান শেয়ারের মূল্য আর শেয়ারসূচক দারুণভাবে পড়ে যায়। করোনার অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশের শেয়ারবাজারে ভালুকজ্বর চলছিল। প্রায় একটানা শেয়ারের দাম নামতে নামতে সূচক ৪০০০ এর নিচে নেমে আসে। শেয়ারবাজারে বিভিন্ন রকম অনিয়ম, কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা-আর সেই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা আর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে নির্লিপ্ততার কারণে শেয়ারবাজারের অবস্থা দিনেদিনে সঙ্গীন হয়ে পড়ে। অবস্থা বিশেষ করে, ইন্ডিভিজুয়াল শেয়ারের মূল্য এত নিচে নেমে আসে যে, বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দাম আরো পড়ে যাবার ভয়ে, পুঁজি বাঁচাতে তারা নিজেরাই কাছে থাকা শেয়ার পানির দামে বিক্রি করতে শুরু করে। এর সঙ্গে যোগ হয়, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ফোর্সড সেল। এসব কারণে সেল প্রেশার অসম্ভব বেড়ে যাওয়ায় শেয়ারের মূল্য তলানিতে এসে ঠেকে। বাজারে আতঙ্ক রোধ করতে এই সময় বিএসইসি শেয়ারের ন্যূনতম ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেয়। এ অবস্থাটা ছিল মন্দের ভালো, যদিও এই দামেও শেয়ার বিক্রেতার সংখ্যা কম ছিল না। তার বিপরীতে ক্রেতার সংখ্যা ছিল বেশ কম।
আমাদের শেয়ারবাজারের এই অবস্থার প্রেক্ষিতে অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে বিগত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যার মধ্যে কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো খুবই ইতিবাচক ছিল। কিন্তু বাজেট পাশের দিন এগুলো প্রত্যাহার করা হয়। এখন ছুটির কারণে আমাদের শেয়ারবাজার বন্ধ। প্রশ্ন হলো—করোনা পরবর্তীকালে আমাদের শেয়ারবাজারের চিত্রটি কেমন হবে? স্বাভাবিক ভাবেই ধারণা করা যায় যে, অবস্থা আগের মতোই থাকবে বা এর চেয়ে কিছুটা খারাপ হতেও পারে। কিন্তু সবাই আন্তরিক থাকলে, এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুব কঠিন হবে না। ইতিমধ্যে বিএসইসিতে চেয়ারম্যান, মেম্বারদের পরিবর্তন এসেছে। আর তাতে বিনিয়োগকারীরা নতুন আশায় বুক বাধতে শুরু করেছে।
অবস্থার উত্তরণে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সেগুলো এরকম হতে পারে— ১) দেশের করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আর মার্কেট স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসের কোনো পরিবর্তন না করে-রেগুলার ট্রেডিং চালু রাখা। ২) ইতিপূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকা করে যে পুঁজি সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছিল, তার তত্ত্বাবধানসহ- সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে কি না—তা মনিটর করা। ৩) ক্রেডিট কার্ডসহ অন্যান্য ঋণের মতো শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা। এই সময় পর্যন্ত সব গ্রাহককে খেলাপি চিহ্নিত না করা এবং ঐ গ্রাহকের শেয়ার যাতে ফোর্সড সেল না করা হয়, তার জন্য বিএসইসির মাধ্যমে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া। উল্লেখ্য, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপতি ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর প্রদেয় ডিভিডেন্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে আর সেই সঙ্গে ডিভিডেন্ড যাতে সেপ্টেম্বরের আগে বণ্টন না করা হয়, তার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শেয়ার বিনিয়োগকারীদেরকে হতাশ করেছে। ৪) মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেনা শেয়ারের বিপরীতে মার্চ থেকে জুন ২০২০ পর্যন্ত এক প্রান্তিকের ঋণের সুদ মওকুফের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৫) কোম্পানির ইপিএস এর ৬০ শতাংশ ডিভিডেন্ড পে-আউট নিশ্চিত করে আসন্ন বাজেটে প্রস্তাব করা। এর ৫০ শতাংশ যাতে নগদে প্রদান করা হয়, তার ব্যবস্থা নেওয়া। উল্লেখ্য, এই বছর থেকে এর বাস্তবায়নের অঙ্গীকার গতবার করা হয়েছিল। ৬) যেসব কোম্পানির স্পন্সর ডাইরেক্টরদের এককভাবে ২ শতাংশ এবং মিলিত ভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই, তাদেরকে এই পরিমাণ শেয়ার ক্রয়ের সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত বর্ধিত করা।
এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরিভাবে যা করতে হবে তা হলো-ফোর্সড সেল বন্ধের নির্দেশ প্রদান। কারণ, এই দামে ফোর্সড সেল করা হলে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হবে তেমনি সেল প্রেশার বেড়ে গিয়ে শেয়ারবাজারে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। করোনা পরবর্তীকালে শেয়ারবাজার আর বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের বাঁচাতে দেশে দেশে প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হচ্ছে। ভারতে ৫০ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে। এর ইতিবাচক প্রভাবে সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়। আমাদের দেশেও এরকম কিছু করা যায় কি না—তা ভেবে দেখা দরকার।
লেখক :কো-চেয়ারম্যান
এফবিসিসিআই স্টান্ডিং কমিটি অন ক্যাপিটাল মার্কেট