বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রদুর্ভাবের বয়স প্রায় ছয় মাস হইতে চলিল। ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতির সকল খাতে এমন ধস নামিয়াছে, যাহা গোটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোমর ভাঙিয়া দিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। যদি এই মুহূর্ত হইতে আর করোনা সংক্রমণ না বাড়ে এবং এখনই বিশ্ব হইতে করোনা ভাইরাস উধাও হইয়া যায়, তাহা হইলেও অর্থনীতির কোমর সোজা করিয়া দাঁড়াইতে কত সময় লাগিবে তাহা কেহই সুনির্দিষ্ট করিয়া বলিতে পারিতেছেন না। কিন্তু হায়! করোনার বিস্তার থামিয়া যাওয়া তো দূরের কথা, উহা এখন নির্বিচারে ঘরে ঘরে প্রবেশ করিতে শুরু করিয়াছে। সুতরাং আমাদের দেশের এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি অনুমেয়। বোদ্ধারা অনেকেই ধারণা করিতেছেন, ১৯৩০ সালের মহামন্দার পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে হইবে বিশ্বকে। আবার অনেকে ভাবিতেছেন, পরিস্থিতি ১৯৩০ সালের চাইতেও অনেক বেশি শোচনীয় হইতে পারে। কারণ সেই সময়ে বিশ্বে জনসংখ্যা ছিল ২০০ কোটি আর এখন কমবেশি ৭৮০ কোটি। সকল দেশেই কলকারখানা, শ্রম, বাণিজ্য বাড়িয়াছে জ্যামিতিক হারে। কর্মচঞ্চল হইয়াছে মানুষ, বাড়িয়াছে ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনমান। বিজ্ঞানের সূত্র অনুসারে গতি যত থাকে, তাহা বাধার সম্মুখীন হইলে ধাক্কাও তত জোরে লাগে। সেই কারণে করোনার ধাক্কা লাগিয়াছে অকল্পনীয়ভাবে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ইতোমধ্যেই বেকারত্বের সম্মুখীন হইয়াছে। এই অবস্থায় সকল কিছু বন্ধ হইয়া থাকার যে পরিণতি, তাহা এখনই পরিমাপ করা দুঃসাধ্য। এই সকল কারণেই ধনী দেশগুলির সরকার ট্রিলিয়ন আকারে ডলার পুশ করিতেছে বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সচল রাখিতে। তাহার পরও থামিয়া যাইতেছে চাকা।
বাংলাদেশেও একই চিত্র বিদ্যমান। বহু প্রতিষ্ঠান লে-অফ ঘোষণা করিতে বাধ্য হইতেছে। সরকারের বহু প্রকল্প অনিশ্চয়তায় পড়িয়াছে। কী করার আছে? গতকাল শুক্রবার ভারত সরকার ঘোষণা দিয়াছে, আগামী এক বত্সর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কোথাও কোনো নূতন প্রকল্প চালু করিবে না। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকেও বুঝিতে হইবে, যাহারা সকল কিছু ঠিক হইয়া যাইবে বলিয়া ধুয়া তুলিতেছেন, তাহারা আর যাহাই হউক, শুভাকাঙ্ক্ষী নহেন। বুঝিতে হইবে, সামনের দিনগুলিতে একদিকে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়িতে থাকিবে, অন্যদিকে ব্যবসায়-বাণিজ্য মন্থর হইয়া পড়িবে বলিয়া সুস্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে। সুতরাং আমাদের সরকারের জন্য সেই পুরোনো বাগ্ধারাই যথাযথ, ‘Cut your coat according to your cloth’। অর্থাত্ কাপড়ের পরিমাণের বিবেচনায় কোট তৈরি করো। মনে রাখিতে হইবে, ইহা কোনো সাময়িক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস বা বন্যার বিষয় নহে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাহার একটি গানে বলিয়াছেন, ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া—/ দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া’। মনে রাখিতে হইবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধরনের মন্দ হাওয়া মোকাবিলা করিবার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের নাই। ইহা অত্যন্ত স্থির চিন্তা ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়া মোকাবিলা করিতে হইবে।