ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন

উত্তরবঙ্গবাসীর বহুদিনের দাবি ছিল রাজশাহী-ঢাকা রুটে বিরতিহীন ট্রেন চালু ও ট্রেনে আমসহ মৌসুমি ফল পরিবহন। গত বত্সর ২৫ এপ্রিল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজশাহী-ঢাকা রুটে বিরতিহীন ও অত্যাধুনিক আন্তঃনগর ট্রেন বনলতা এক্সপ্রেসের শুভ উদ্বোধন করেন। ‘বনলতা’ নামটি আসিয়াছে কবি জীবনানন্দ দাশের অমর সৃষ্টি ও বিশেষ কাব্যিক চরিত্র নাটোরের বনলতা সেনের নামানুসারে। এই ট্রেনটি উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর আম স্বল্পমূল্যে ঢাকায় লইয়া যাওয়ার জন্য ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন চালুর প্রতিশ্রতি দেন। অবশেষে তিনি তাহার সেই কথাও রাখিলেন। গত শুক্রবার উদ্বোধন করা হইল এই ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন। করোনা দুর্যোগকালে এই সুবিধার অর্থনৈতিক গুরুত্ব মোটেও কম নহে। এই ট্রেনে মোট ছয়টি ওয়াগন রহিয়াছে। প্রতিটি ওয়াগনে ৪৫ হাজার কেজি আম নেওয়া যাইতেছে। প্রথম দিন প্রায় ১ হাজার কেজি আম লইয়া ট্রেনটি রওয়ানা হয় ঢাকার উদ্দেশে। সপ্তাহের সাত দিনই চাঁপাইনবাবগঞ্জ হইতে বিকাল ৪টায় ট্রেনটি ছাড়িয়া যাইতেছে। ইহাতে এক কেজি আমের ভাড়া লাগিতেছে মাত্র এক টাকা ৩১ পয়সা। এই সুবিধা লাভ করিয়া এই এলাকার আমচাষিরা অত্যন্ত খুশি। আবার রাজধানী ঢাকার মানুষ কম দামে আম খাইতে পাইয়া সন্তুষ্ট ও আনন্দিত।

বলা হইয়া থাকে, ফলের রাজা আম। আর আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এই জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল এই আম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের সূত্রে জানা যায়, বিশ্বে আম উত্পাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। আবার কৃষি বিভাগ জানায়, প্রতি বত্সর আমাদের দেশে গড়ে ৭ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৩০ টন আম উত্পাদিত হয়। তাহার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এককভাবে উত্পাদিত হয় প্রায় ২ লক্ষ টন; কিন্তু এই দেশে আধুনিক পদ্ধতিতে আমের চাষ ও উন্নত বিপণনব্যবস্থা গড়িয়া না উঠায় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিদেশে পর্যাপ্ত আম রফতানি করা যাইতেছে না। আম সংরক্ষণে হিমাগারেরও অভাব রহিয়াছে এই দেশে। এই সকল সমস্যার সমাধান করিতে পারিলে উত্পাদিত আম বিদেশে রফতানি করিয়া প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

আমের নানাবিধ ব্যবহার, স্বাদ-গন্ধ ও পুষ্টিমানের জন্য ইহা একটি আদর্শ ফল হিসাবে বিবেচিত। বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু ও আবহাওয়া—সকলই আম চাষের জন্য বেশ উপযোগী। বর্তমানে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা ও যশোর নহে, প্রায় সকল জেলাতেই আম উত্পাদিত হয় কমবেশি। এমনকি উপকূলীয় লবণাক্ত ভূমি ও পার্বত্য জেলার জুমচাষ এলাকায়ও মিষ্টি ও উন্নত জাতের আমের চাষ হইতেছে। ইহাকে কাজে লাগাইয়া আমের চাষ আরো সম্প্রসারণ করা যায়। এদিকে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেনে শুধু আম নহে, সকল ধরনের শাকসবজি, ফলমূল, ডিমসহ অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যও ঢাকায় আনয়ন করা যাইতেছে। এইজন্য আমরা মনে করি, আমের মৌসুম ছাড়াও এই ট্রেন স্থায়ীভাবে চলাচল করিতে পারে।