বাঁধ মেরামতে কালক্ষেপণ কাম্য নহে

বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবরে দেখা যাইতেছে, জোয়ারের পানিতে আবারও তলাইয়া গিয়াছে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ভাঙিয়া যাওয়া বেড়ি বাঁধ। ফলে লোকালয়ে ঢুকিয়া পড়িয়াছে পানি। সেই ছবিও পত্রিকায় ছাপা হইয়াছে। এই চিত্র এখন খুলনার কয়রা সদর এলাকাসহ উপকূলীয় অনেক এলাকার। ঘূর্ণিঝড় আম্ফান-পরবর্তী দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হইয়াছে; কিন্তু এখনো স্বাভাবিক হয় নাই খুলনার উপকূলবাসীর জীবনযাত্রা। জোয়ারের পানিতে দিনে অন্তত দুইবার তাহারা ডুবিতেছেন। আবার ভাটায় জাগিয়া উঠিতেছেন। কয়রা উপজেলার প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ এখন রহিয়াছে দুর্বিষহ অবস্থায়। ইহার মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করিতেছে স্থায়ীভাবে পানির মধ্যে। সেইখানে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট এখন প্রকট। গত ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হানিবার পর খুলনার ৯টি উপজেলার ৮৩ হাজার ৫৬০টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় সাড়ে চার লক্ষ মানুষ। কয়রায় ওয়াপদার বাঁধ ভাঙিয়া লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় এখানকার প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধ ভাঙিয়া গিয়াছে; কিন্তু বাঁধ মেরামতে এখনো কোনো তত্পরতা দেখা যাইতেছে না। ফলে দূরও হইতেছে না মানুষের দুর্ভোগ ও দুর্ভাবনা।

এদিকে খুলনার কয়রা উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দুইটি পোল্ডারে বাঁধ মেরামতের জন্য বাস্তবায়িত ও চলমান প্রকল্পের সাড়ে ৯ কোটি টাকার কাজের কোনো অস্তিত্ব এখন পাওয়া যাইতেছে না। কারণ ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে বেশির ভাগ স্থানই ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজের মান ভালো না হওয়ায় বা কাজ শেষ করিতে কালক্ষেপণ করায় কাজের মধ্যখানে আসিয়া এইভাবে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে এবং সরকারি অর্থ জলে গিয়াছে। খুলনার নাগরিক সমাজের দাবি, এইখানে প্রতি বত্সরই বেড়ি বাঁধ ভাঙিয়া উপকূলীয় জনপদ প্লাবিত হয়; কিন্তু সময়মতো বাঁধ সংস্কার করা হয় না। বাঁধ সংস্কার করিলেও তাহা হয় না টিকসই। ইহা শুধু খুলনার চিত্র নহে, অন্য অনেক এলাকায় একই পরিস্থিতি বিদ্যমান। ষাটের দশকে তৈরি এমন অনেক বেড়ি বাঁধ রহিয়াছে, যাহা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ তাহা সংস্কার করা হইতেছে না। এমনকি সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ এতদিন পরও মেরামত করা হয় নাই—এমন দৃষ্টান্তও রহিয়াছে। অবশ্য সাম্প্রতিক কালে হাওর অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে মজবুত বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের টাকা দিয়াও মেরামত করা হয় কিছু কিছু বাঁধ; কিন্তু এই বাঁধগুলি দেখাশোনার জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পর্যায়ের যে ইঞ্জিনিয়ারগণ রহিয়াছেন, তাহাদের দায়িত্বশীলতা লইয়া প্রশ্ন আছে। চিঠির পর চিঠি দিয়া বাঁধ মেরামতের তাগিদ দেওয়া হইলেও তাহাতে অনেক সময় কর্ণপাত করা হয় না। অনেক সময় থাকে বাজেটস্বল্পতার সমস্যাও।

দেশের বিভিন্ন এলাকার বাঁধ ভাঙিয়া গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অনেক সময় তাহা সরেজমিনে দেখিতে যান। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের দ্রুত বাঁধ নির্মাণ বা মেরামতকাজ শেষ করিবার নির্দেশ দেন; কিন্তু কাজটি কেন যথাসময়ে হইল না, তাহা লইয়া কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেন না। অনেক সময় দায়িত্ব অবহেলার জন্য শোকজ করা হয়; কিন্তু শুধু শোকজ দিয়া কি দেশ চলিতে পারে? আজ হউক বা কাল হউক, জনগণ একদিন সরকারি কাজের অনিয়ম ও কালক্ষেপণের বিরুদ্ধে জাগিয়া উঠিবে এবং তখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হইলেও হইতে পারে। সরকারি কাজে প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।