বর্ণবাদ প্রথা একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসবাদ

জাহিদুল ইসলাম

মানব প্রজাতি একই সঙ্গে বুদ্ধিমান ও আত্মঘাতী প্রাণী। মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞানকাণ্ড অনেক সময় অপরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। কারণ, জ্ঞান অনেক সময় ক্ষমতাকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণের করে। জ্ঞানের সঙ্গে রয়েছে ক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক। এজন্য ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো জ্ঞান ও ক্ষমতাকে এক করে দেখতেন। ফুকোর মতে, জ্ঞান ক্ষমতাকে বৈধ দেয় এবং ক্ষমতা জ্ঞানকে টিকিয়ে রাখে।

জ্ঞানের সঙ্গে ক্ষমতা সম্পর্কের একপর্যায়ে যখন অস্থিরতা ও সহিংসতার উদ্ভব ঘটে, তখন জন্ম দেয় সন্ত্রাসবাদের। ক্যারিবীয় তাত্ত্বিক ফ্রানত্স ফানো তার ‘Wretched of The Earth’ গ্রন্থে এ ধরনের সন্ত্রাসবাদের নাম দিয়েছেন জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসবাদ।

এ সন্ত্রাসবাদের মূলে রয়েছে একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং সেই ‘অপরকে’ নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ করা? একই সঙ্গে এই নিয়ন্ত্রণ এবং শোষণকে বৈধ করার জন্য বিভিন্ন ডিসকোর্স তৈরি করা হয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইউরোপীয় দেশগুলো আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশে তাদের শাসনকে বৈধ করার জন্য বিভিন্ন ডিসকোর্স তৈরি করে। তাদের জ্ঞানকাণ্ড দ্বারা নির্মিত ডিসকোর্সগুলো এখন প্রভাবশালী। আমরা এখনো এগুলো বিশ্বাস করি। আমাদের বিভিন্ন বই-পুস্তকে এখনো আফ্রিকাকে বলা হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ। মূলত ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই ডিসকোর্সটি নির্মাণ করে। প্রাচীন সভ্যতার বাহক আফ্রিকার কালোরা ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে মনে হয় যেন তারা সভ্যতার দাস। তাদেরকে সভ্য ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্যেই একসময় ঔপনিবেশিক শাসকরা তৈরি করেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের কথা শুনলেই আমাদের হিটলারের নািস বাহিনীর কথা মনে হয়। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম কনসেন্ট্রেশনের ক্যাম্প পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শাসকরাই তৈরি করেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কেনিয়ায় তৈরি করা হয় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। হিটলারের দোষ, তিনি তার বর্ণবাদী আচরণকে ইউরোপ পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন। যখন ইউরোপীয় অন্যান্য দেশ তাদের বর্ণবাদী আচরণকে সীমাবদ্ধ রাখে আফ্রিকা এবং এশিয়াতে। অন্যদিকে জার্মানরা হঠাত্ করেই হিংস্র বা বর্ণবাদী হয়ে ওঠেনি। তারা প্রথম আফ্রিকায় তাদের বর্বরতা প্রয়োগ করে। নামিবিয়ার হেরেরা নামক জনগোষ্ঠী, সামোয়ানস বা মাপুসে জনগোষ্ঠীই প্রথম জার্মানের বর্বর ও হিংস্র আচরণের শিকার হয়। কিন্তু জার্মানের হিংস্র আচরণের কথা যখন আসে তখন শুধু ইহুদিদের প্রতি নির্যাতনের কথা আসে; পশ্চিমাদের তখন জার্মানদের আফ্রিকা শাসনের কথা মনে আসে না।

ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে এখনো তাদের দেশের নাগরিকদের স্কুল-কলেজে এ শিক্ষা দেওয়া হয় যে, এশিয়া ও আফ্রিকায় তাদের শাসন বৈধ ছিল। তাদের এ শাসন ও শোষণ ছিল প্রাচ্যকে সভ্য করার জন্য।

ঔপনিবেশিক শাসকরা সাদা ও কালোদের মধ্যে যে বিভাজন ও বৈষম্য তৈরি করে, তার জন্য অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে ঔপনিবেশিক-পরবর্তী বিভিন্ন দেশকে। সংখ্যালঘু কৃষ্ণাঙ্গরা নিজের দেশেই অনেক সময় বৈষম্যের শিকার হন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনের গর্ভেই জন্ম নেয় ক্রীতদাস প্রথা। ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্তি হওয়ার পরও আমেরিকায় বর্ণবাদী বিভিন্ন ব্যবস্থা বহাল থাকে। কিন্তু এসব সত্যকে আমেরিকান শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা নিজেদের বিভিন্ন জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় বিকৃত ও গোপন করেছেন।

এ সত্য বিভিন্ন সময় আমেরিকান সাহিত্যিক বা গবেষকদের লেখায় ফুটে উঠেছে। সর্বশেষ সাহিত্যকর্ম হিসেবে কৃষ্ণাঙ্গ লেখক কোলসন হোয়াইটহেড-এর ‘The Nickel Boys’ উপন্যাসের কথা বলা যায়। এ উপন্যাসটি এ বছর পুলিত্জার পুরস্কার পেয়েছে। এ উপন্যাসটি বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা। বইটিতে ১৯৬০-এর দশকে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের বর্বরতা চিত্র ফুটে উঠেছে। ডোজার স্কুলের যে চিত্র এ উপন্যাসে উপস্থাপন করা হয়, সে স্কুলে ২০১১ সালে গোপন কবর খুঁড়ে প্রায় ৮০ কৃষ্ণাঙ্গের লাশ পাওয়া যায়। এভাবে হয়তো আমেরিকান বর্ণবাদী সহিংসতার অনেক নজির গুপ্ত অবস্থায় রয়েছে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়