নূতন বত্সরে স্বস্তিময় পৃথিবীর স্বপ্ন

নূতন বত্সরে মানুষ নূতন করিয়া স্বপ্ন দেখিতে ভালোবাসে। মানুষ আশা করে, অতীতে যাহা সে পায় নাই, নূতন বত্সরটিতে সেই স্বপ্নপূরণের পথে আগাইয়া যাইতে পারিবে হয়ত। মানবসভ্যতা বিকাশের পর হইতে এখন অবধি ‘অশান্তির ছায়া’ কখনো তাহার পিছু ছাড়ে নাই।

গত শতাব্দীর শুরুতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্ববাসীকে বলা হইয়াছিল, সকল যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যেই নাকি ওই যুদ্ধ। কিন্তু, বাস্তবে তাহা হয় নাই। তাহা হইবারও নহে। কারণ, যুদ্ধই পরাশক্তিদের সাম্রাজ্যবিস্তারে সবচাইতে বড় হাতিয়ার। পরাশক্তিদের শক্তিত্ব অটুট রাখিবার প্রধান রসদ জোগান দেয় সমরশক্তিই। সুতরাং বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধের অবসান কপোলকল্পিত ভাবনা বটে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন শান্তি না আসুক, স্বস্তি কি আসিবে না এই ধরাধামে? একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়া বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কল্যাণে উত্পাদন ও সম্পদ অর্জনের দিক দিয়া মানবজাতি আজ এমন এক অবস্থায় উন্নীত হইয়াছে যে, বিশ্বের সাড়ে সাত শত কোটি মানুষকে স্বস্তিদায়ক ও সম্মানজনক জীবন উপহার দেওয়া খুব কঠিন কাজ নহে। বিশ্বব্যাপী সব ধরনের উত্পাদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হইয়াছে, বৃদ্ধি পাইয়াছে সম্পদের পরিমাণ। সকল দেশেই কমবেশি বাড়িতেছে প্রাচুর্য ও ভোগবিলাস। কিন্তু এত প্রাচুর্যময় পৃথিবীতেও মানুষের মনে স্বস্তি আসিবে না কেন? ইন্সটিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস (আইইপি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত এক দশকে পৃথিবী আরো অশান্ত হইয়াছে। বিশেষ করিয়া মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলিতে বাড়িয়াছে যুদ্ধ ও সংঘাত। গ্লোবাল পিস ইনডেস্ক অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশ আরও অশান্ত হইয়াছে। অশান্তির এত ডামাডোলের মধ্যে বসবাস করিয়া আমরা কি আসলেই শান্তির কথা ভাবিতে পারি? কাহারো চোখেও কি আমাদের দেখিতে পাইব না স্বস্তিদায়ক পৃথিবী বিনির্মাণের স্বপ্নাঞ্জন? নাকি সকল শান্তি বা স্বস্তির আশ্বাস এক ধরনের ধোঁকা? স্বস্তিদায়ক বিশ্বের স্বার্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠন করা হইয়াছিল জাতিসংঘ। কথা ছিল সেইখানে উন্নত-অনুন্নত, ধনী-দরিদ্র—সকল রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা তাহাদের কথা বলিতে পারিবে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করিয়া নষ্ট করা হইয়াছে জাতিসংঘের মূলশক্তিকে। যাহার ফলে কোনো কোনো রাষ্ট্র জাতিসংঘকে পাশ কাটাইয়াও নিজের পছন্দানুযায়ী সিদ্ধান্ত লইতে দ্বিধা করে না। বিশ্বজুড়িয়া যাহারা মোড়লগিরি করিতেছে, তাহাদের অঙ্গুলিহেলনেই মঞ্চায়িত হইতেছে যাবতীয় ঘটনা। কথিত উদার গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ-প্রতিযোগিতাবাদ ইত্যাদির ভিতর দিয়া বহাল রাখা হইতেছে বিচিত্র ধরনের যুদ্ধাবস্থা।

পরাশক্তিরা ভালো করিয়াই জানে যে, তাহাদের থামাইবার শক্তি কাহারো নাই। কেহই আগাইয়া আসিবে না। যদি-বা কেহ আগাইয়া আসে, তবে নিশ্চয়ই তাহার অন্য কোনো অভিসন্ধি রহিয়াছে—শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে অবশ্যই নহে। আসলে, যদি শান্তিই হইত প্রকৃত অভিলক্ষ্য তাহা হইলে পৃথিবীতে এত সংঘাত আর হানাহানি অনেক আগেই জাদুঘরে চলিয়া যাইত। সবচাইতে বড় প্রহসন হইল—শান্তির কথা বলিয়াই পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করা হইয়াছে এবং হইতেছে।

নূতন বত্সরটি কি আবহমানকাল ধরিয়া চলমান পরাশক্তিদের এই নীতির বিপরীতে সুমতি আনিবার স্টেট অব মাইন্ড তথা মনস্তত্ত্ব তৈরি করিতে পারিবে?