ইত্তেফাক রিপোর্ট
চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, করোনার কারণে সাধারণ মানুষের আয় কমে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ শতাংশ। এর পাশাপাশি আয় ও ভোগের বৈষম্যও বেড়েছে। গতকাল রবিবার দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনা করে আয়োজিত ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ‘চ্যালেঞ্জেস অব পলিসিমেকিং ইন টাইম অব প্যান্ডেমিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
এতে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হলেও বৈষম্য বাড়ছিল। কোভিড-১৯ এর কারণে এই বৈষম্য আরো বাড়বে। নিম্ন আয় সীমার মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে যাবে। যতদিন অর্থনীতি স্বাভাবিক না হবে ততদিন তাদের দারিদ্র্য রেখার ওপরে উঠে আসা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, দুর্যোগের সময়ে প্রবৃদ্ধি নিয়ে অতি চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে জোর না দিয়ে জীবন ও জীবিকার দিকে বেশি জোর দেওয়া উচিত।
মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী তখন দারিদ্র্য হার ছিল সাড়ে ২৪ শতাংশ। ২০১৯ সাল শেষে অনুমিত হিসাবে তা নেমে আসে সাড়ে ২০ শতাংশে। বর্তমানে করোনার কারণে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের আয় কমেছে। ফলে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে আয়ের বৈষম্য চার বছরে ৪৮ পয়েন্ট থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৫২ পয়েন্ট। সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। এটাও অনেক বেশি। কারণ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে অত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এখন জিডিপিতে গুরুত্ব না দিয়ে সাধারণ মানুষের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থনীতি পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় অনেক দুর্বল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোভিড-১৯ এর কারণে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা হতে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা কম হবে। নতুন প্রণোদনায় যাওয়ার আগে লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে হবে। সেই সঙ্গে কর ফাঁকি বন্ধ করাসহ স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানায় সিপিডি।
সিপিডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবছর যে বাজেট দেওয়া হয় তার ৮০ ভাগও বাস্তবায়ন হয় না। এডিপির বাইরে যে ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয় তার ১৮ শতাংশ বাস্তবায়ন হয় না। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করেছে সরকার। আগামী অর্থবছরেও ঋণ গ্রহণ বাড়বে। ব্যাংকগুলোর যে অবস্থা তাতে ব্যাংক হতে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। আগামী বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না।
করোনার প্রভাবে রেমিট্যান্স কমে গেছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীদের সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি। সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। আসছে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এই খাতে অর্থের ব্যবহার দুর্নীতি মুক্ত রাখতে হবে।
বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, করোনার কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, অনেকে কম বেতন পেয়েছেন। আগামী বাজেটকে বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপরে দাঁড় করতে না পারলে অর্থনীতির কাঠামো দুর্বল হয়ে যাবে।