কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া ধান উত্পাদন বৃদ্ধিপূর্বক এই ক্ষেত্রে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করিয়াছি। কিন্তু প্রাণিজ আমিষ উত্পাদনে আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য লাভ করিতে পারি নাই। মাছের চাহিদা পূরণে আমরা অগ্রগতি লাভ করিলেও এবং মত্স্য উত্পাদনে বিশ্বের চতুর্থ দেশ হইলেও ডিম, মাংস ও দুধ উত্পাদনে আমরা এখনো পিছাইয়া আছি। সম্প্রতি আমরা কোরবানির পশুর চাহিদাপূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণ হইয়াছি। কিন্তু সারা বত্সরের মাংসের যে চাহিদা বিদ্যমান তাহাতে এখনো স্বাবলম্বিতা অর্জন করিতে পারি নাই। এই চাহিদা ছাগল উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বহুলাংশে পূরণ করা সম্ভব। আমিষের অভাব মানুষের শারীরিক, মানসিক ও মেধা বিকাশে প্রতিবন্ধক। এইজন্য প্রাণিজ আমিষের সকল খাতেই আমাদের সাফল্য লাভ করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া ছাগল উত্পাদন বাড়াইয়া ইহার দুধ ও মাংসের মাধ্যমে আমরা গুণগত মানসম্পন্ন আমিষের সরবরাহ নিশ্চিত করিতে পারি।
আশার কথা হইল, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ ইনস্টিটিউট সম্প্রতি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জাত উন্নয়নে গবেষণার ক্ষেত্রে অনেকদূর আগাইয়া গিয়াছে। উত্পাদন বৃদ্ধি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতটি ছড়াইয়া দেওয়াই ইহার উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যে ৪৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়াছেন তাহারা। প্রস্তাবে বলা হইয়াছে যে, এই জাতের ছাগল বত্সরে দুইবার বাচ্চা দেয় এবং প্রতিবার বাচ্চা হয় দুই হইতে তিনটি করিয়া। এইজন্য ছয়টি জেলায় এই ছাগল পালনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হইবে।
উল্লেখ্য, আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের এই ছাগল মাংস ও চামড়ার জন্য বিশ্ববিখ্যাত। ইহার মাংস বিশ্বব্যাপী পরিচিত ‘কুষ্টিয়া গ্রেড’ নামে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ছাগলের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৭৬ লক্ষ, যাহার ৯০ শতাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। এই ছাগলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল ইহা দ্রুত বর্ধিষ্ণু ও প্রজননক্ষম, পরিবেশসহিষ্ণু এবং অল্প জায়গায় পালন করা যায়। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে বত্সরে প্রায় এক লক্ষ ২৭ হাজার মেট্রিক টন ছাগলের মাংস উত্পাদিত হয়— যাহা মোট উত্পাদিত গবাদিপশুর মাংসের প্রায় ২৫ ভাগ। মাংস উত্পাদনে এই হার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কিন্তু ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের অসুবিধা হইল ইহার আকৃতি একটু ছোট ও মাংস কম হয়। তবে বর্তমানে ইহাও কোনো সমস্যা নহে। কেননা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক বেঙ্গলের জীবনরহস্য উন্মোচন (জিনোম সিকোয়েন্সিং) করিয়াছেন। তাই এখন ইহার জাত উন্নয়নের পথ খুলিয়া গিয়াছে। ইহার ওজন ও মাংসের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহার হ্রাসের ব্যাপারে এখন আমরা মনোযোগী হইতে পারি। এই পরিপ্রেক্ষিতে উপর্যুক্ত প্রস্তাবটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনে ইহার সহজ প্রযুক্তিগুলি যদি মাঠ পর্যায়ে হস্তান্তর করা যায়, তাহা হইলে ছাগল উত্পাদনেও আমরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করিতে পারি। গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ সহায়ক বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে।