গ্রাহকের কাছে মনেই হবে এটা কাস্টমার কেয়ারের নাম্বার। হুবহু ডিজিট। অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে গ্রাহক দিয়ে দিচ্ছেন তার মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের গোপন সব তথ্য। পরে প্রতারকরা হাতিয়ে নিচ্ছেন গ্রাহকের সব অর্থ। তবে র?্যাব বলছে, নাম্বার এক হলেও প্রতারকদের কলের ক্ষেত্রে সাধারণত নাম্বারের আগে ‘প্লাস চিহ্ন’ থাকে। সম্প্রতি কিছু অভিযোগের তদন্তে এমনটাই বেরিয়ে এসেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে রাজধানী এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা এলাকা থেকে র?্যাব-২ এবং র?্যাব-৮-এর যৌথ অভিযানে এ চক্রের ১৩ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র?্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম।
গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজারে র?্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সারওয়ার বিন কাশেম জানান, ‘গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ১৪ লাখ ৮৩ হাজার ৪৬২ টাকা, ৩১টি মোবাইল ফোন, দুটি ল্যাপটপ, দুটি ট্যাব ও ১২০টি সিম উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন—নাজমুল জমাদ্দার, হাসান মীর, ইব্রাহিম মীর, তৌহিদ হাওলাদার, মোহন শিকদার, পারভেজ মীর, সোহেল মোল্যা, দেলোয়ার হোসেন, সৈয়দ হাওলাদার, রাকিব হোসেন, মোহাম্মদ আলী মিয়া, পলাশ তালুকদার ও ইমন।
লে. কর্নেল সারওয়ার বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে মানুষের বাইরে যাওয়া এড়াতে মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে প্রতারক চক্র। গ্রেফতার প্রত্যেকেই প্রাথমিকভাবে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।’ এক জন মাস্টরমাইন্ডের অধীনে ৩০-৩৫ জন সদস্য কাজ করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাধারণত পাঁচটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে চক্রটি। প্রথমত, চক্রের ‘হান্টার টিমের’ সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে গ্রাহকদের তথ্য সরবরাহ করে থাকেন। তারা বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের নাম্বার সংগ্রহ করে মাস্টারমাইন্ডদের সরবরাহ করেন।
দ্বিতীয় ধাপে ‘স্পুফিং টিমের’ সদস্যরা কাস্টমার কেয়ার নাম্বার কিংবা ব্যাংক কর্মকর্তার নাম্বার ক্লোন করেন। প্রতারকরা যখন গ্রাহকদের টার্গেট করে ফোন দেয়, তখন হুবহু সংশ্লিষ্ট নাম্বারটি দেখতে পান। এতে গ্রাহকরা বিভ্রান্ত হয়ে অনেক উচ্চশিক্ষিতরাও ফাঁদে পা দেন। প্রতিটি নাম্বার ক্লোন করতে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পায় এই টিমের সদস্যরা। তৃতীয় ধাপে সবচেয়ে প্রধান কাজটি করে থাকেন ‘কাস্টমার কেয়ার’ টিমের সদস্যরা। তারা ১৫-২০ জন একসঙ্গে একটি রুমে বসে কথাবার্তা বলে সত্যিকারের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের আবহ তৈরি করেন। গ্রাহককে ফোন দিলে আশপাশের নয়েজের মাধ্যমে তাকে বিভ্রান্ত করা হয়। চক্রের মাস্টারমাইন্ড নিজেই কাস্টমার কেয়ার কর্মকর্তা সেজে কৌশলে গ্রাহকের গোপন পাসওয়ার্ডসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে থাকেন। সঙ্গে থাকা অন্যকেউ অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে অর্থ হাতিয়ে নেন।
চতুর্থ ধাপে ‘টাকা উত্তোলন’ টিমের সদস্যরা গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ ট্রান্সফারের পর পর দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা এজেন্টদের মাধ্যমে নগদ টাকা উঠিয়ে নেন। শেষ ধাপে ‘ওয়াচম্যান’ টিমের সদস্যরা এলাকায় নতুন কোনো আগন্তুক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সন্দেহ হলে মাস্টারমাইন্ডকে খবর দেন। তারা চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। প্রতারণার অর্থ দলের মাস্টারমাইন্ড নেন ৫০ ভাগ। আটকদের মধ্যে ৯ জনই মাস্টারমাইন্ড উল্লেখ করেন র?্যাবের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন ‘প্রতারকদের স্পুফিং নাম্বারের আগে সাধারণত ‘প্লাস চিহ্ন’ থাকে। যেমন কোনো কাস্টমার কেয়ারের নাম্বার যদি ‘১২২১’ হয়, তাহলে প্রতারকদের দেওয়া ফোন কলে নাম্বার হবে ‘+১২২১’।’