একুশ শতকের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা

গল্পটি আমরা সবাই কমবেশি জানি—হ্যামিলন শহরবাসী ইঁদুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এক বংশীবাদক তার বাঁশির সুরের জাদুতে শহর থেকে সব ইঁদুর বের করে নিয়ে গেল। গল্প এখানেই শেষ নয়—ইঁদুর তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাঁশিওয়ালাকে প্রতিশ্রুত পুরস্কার না-দেওয়ায় সে বাঁশিতে এমন সুর তুলল যে শহরের সমস্ত শিশু সেই সুরে মোহিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে তার সঙ্গে উধাও হয়ে গেল। আমরাও এই প্রযুক্তির যুগে আমাদের জীবনের স্বর্ণকাল কৈশোর, তারুণ্য সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সুরের পেছনে ব্যয় করে চলেছি। আমরা যদি বাঁশিওয়ালাকে প্রযুক্তিরূপে চিন্তা করি আর বাঁশির সুরকে ফেসবুক ও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে চিন্তা করি আর শিশু বলতে যদি আমাদের কৈশোর, তারুণ্যকে চিন্তা করি তাহলে বিষয়টাকে সমপৃক্ত করতে সহজ হবে।

প্রযুক্তি থেকে বিমুখ থাকার উপায় নাই তারপরও একটু রয়েসয়ে ব্যবহার করার সুযোগ আছে। আর আমাদের সেটাই করা উচিত। আমরা যে সময়টাতে হাতে বই নিয়ে থাকার কথা সেসময়ে আমরা মোবাইলফোন নিয়ে থাকি আর আমরা একটা আজব বই পড়ি, যার নাম ফেসবুক। এই ফেসবুক আমাদের এমনই নেশা ধরিয়ে দিয়েছে যে আমরা আর কিছু চিন্তাই করতে পারি না। নাম দেওয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিন্তু এ এমনই এক মাধ্যম যা মানুষকে শুধু প্রচণ্ডভাবে অসামাজিকই করে না বরং মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে দেয়। ছিনতাই, হুমকি, অপহরণ, প্রতারণা এসবই যেন বেড়ে গেছে এই ফেসবুকের কল্যাণে। শুধু ফেসবুক নয় হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার যা কিছু বলি না কেন সবই এসবের অংশ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে এখন আমাদের ছেলেরা বইয়ের চেয়ে ফেসবুকে অভ্যস্ত বেশি। এখন আমরা ভার্চুয়াল জগতে এতই সামাজিক হয়েছি যে বাস্তবজীবনে আমরা প্রচণ্ডভাবে অসামাজিক হয়ে গেছি। আরো কিছু বিষয় আছে যা আমাদের সমাজের জন্য আশঙ্কাজনক আর তা হলো আমাদের নৈতিকতা। ফেসবুক বা ইউটিউব আমাদের নৈতিকভাবে অনেক বেশি দুর্বল করে দিচ্ছে। এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিষয়বস্তগুলো এমনভাবে সাজানো যাতে একজন মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবিত হতে বাধ্য।

এসব থেকে বের হওয়ার উপায় নাই যদি এমন ভেবে থাকেন তাহলে আসলেই উপায় নেই, কিন্তু যদি ভাবেন আপনি চান এ থেকে নিজেকে, নিজের পরিবারকে, নিজের সন্তানকে বাঁচাবেন তাহলে অবশ্যই আপনি পারবেন। আসলে আমাদের সদিচ্ছার জোরে আমরা এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মরণ ছোবল থেকে বাঁচতে পারি। আমরা যদি প্রযুক্তিকে ভালোভাবে ব্যবহার করি তাহলে প্রযুক্তিও আমাদের ভালো ফলাফল দেবে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানকে অতি অল্প বয়সে হাতে স্মার্টফোন দেন। আর এসবে আসক্তির প্রথম ধাপ হলো স্মার্টফোন। সুতরাং আপনার সন্তান বয়সের একটি নির্দিষ্ট ধাপ পার না হওয়া পর্যন্ত স্মার্টফোন দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। প্রযুক্তিকে রয়েসয়ে প্রশ্রয় দেওয়ার সময় এখনই। লাগাম টেনে ধরতে হবে। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজালেই যেমন শিশুরা ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে, আজ আমাদের সমাজেও সেই প্রযুক্তি নামক বাঁশিওয়ালা প্রতিনিয়ত ডাক দিয়ে যাচ্ছে নিত্যনতুন চিত্তাকর্ষক মাধ্যম হাজির করে। এসব থেকে আমাদের তারুণ্যকে সাবধান করার এখনই উত্তম সময়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়