সম্মিলিত শক্তিতে এই পৃথিবী পুনরায় সুস্থ হউক

করোনা-পরিস্থিতি সারা বিশ্বকে ক্রমশ কঠিন এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলিয়া দিতেছে। গত শনিবার দ্য টেলিগ্রাফের একটি সাক্ষাত্কারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছেন—আসন্ন শীত মৌসুমে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা আসিবে, যাহা হইবে আরো ভয়ংকর! ইউরোপে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ এই মুহূর্তে হ্রাস পাইতে শুরু করিলেও ইহার অর্থ এই নহে যে, মহামারিটি তাহার শক্তি হারাইতেছে। বিশেষ করিয়া, করোনা যদি ১৯১৮-২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর মতো আচরণ করে, তাহা হইলে এই বিশ্বের জন্য অনেক বড়ো দুঃখ অবশিষ্ট রহিয়াছে। ইতিহাস বলে, ১৯১৮ সালের মার্চে স্প্যানিশ ফ্লু যখন প্রথম আবির্ভূত হইয়াছিল, তখন ইহার মধ্যে সাধারণ মৌসুমি অসুস্থতার বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু শরত্কালে ইহা যখন দ্বিতীয় দফায় আরো মারাত্মক আকারে ফিরিয়া আসে, তখন বিশ্বের ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। 

সুতরাং বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের সামনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসাবে হাজির হইয়াছে। এমতাবস্থায়, সার্ক ও আসিয়ানভুক্ত সাতটি দেশের জোট গত শনিবার বিমসটেকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে করোনা-সংকট মোকাবিলায় অঙ্গীকার ঘোষণা করিয়াছেন। সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই অঞ্চলে বড়ো রকমের ধাক্কা দিয়াছে করোনা ভাইরাস। ইহার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও নানামুখী হইবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। সার্ক ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলির মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক সহযোগিতার সবচাইতে বড়ো সেতুবন্ধ হইল এই বিমসটেক। ১৯৯৭ সালে ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক)-এর যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে কেবল বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড ইহার সদস্য হইলেও পরে মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান বিমসটেকে যোগ দেয়। মনে রাখিতে হইবে বিমসটেক সদস্য দেশগুলিতে বিশ্বের জনসংখ্যার ২২ শতাংশের বসবাস। নিঃসন্দেহে কোভিড-১৯-এর ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকরী একটি প্ল্যাটফরম হিসাবে কাজ করিতে পারে বিমসটেক। কেবল মহামারির এই কালবেলায় নহে, মহামারি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাতেও এই প্ল্যাটফরমটিকে কাজে লাগানো যায়।

আসলে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের কোনো প্রচেষ্টাই বাদ রাখা উচিত হইবে না। গত মাসের শুরুতে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের নেতারাও একটি ‘আন্তর্জাতিক জোট’ গঠনের ঘোষণা দিয়াছেন। এই মর্মে ব্রিটেনের দ্য ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় যৌথভাবে একটি ঘোষণাপত্রও প্রকাশিত হয়। করোনা ঠেকাইতে ঐ জোটের পক্ষ হইতে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ইউরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হইয়াছিল। ‘গ্লোবাল কো-অপারেশন প্ল্যাটফরম’ নামের ঐ জোটটির লক্ষ্য হইল কোভিড-১৯-এর টিকার গবেষণা, উন্নয়ন, বিতরণ এবং অন্যান্য চিকিত্সা পদ্ধতি গতিশীল করা। ইউরোপীয় ঐ জোটটির মতো বিমসটেক যদি বড়ো ধরনের কোনো ফান্ড সংগ্রহ করিতে না পারে, তাহা হইলে এই জোট তাহার অন্তর্নিহিত শক্তি কাজে লাগাইতে পারিবে না। বৈশ্বিক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিকা উদ্ভাবন, চিকিত্সা ও থেরাপির জন্য অর্থের সংস্থানই এখন সবচাইতে বড়ো শক্তি। আশা করা যায়, সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে এই পৃথিবী পুনরায় সুস্থ হইয়া উঠিবে।