বজ্রপাতে প্রাণহানি উদ্বেগজনক

গত বৃহস্পতিবার এক দিনে সারাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন ২০ জন। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। বজ্রপাত ক্রমেই আমাদের জন্য একটি বিপজ্জনক ও জাতীয় দুর্যোগ হিসাবে দেখা দিতেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত পাঁচ মাসে বজ্রপাতে মারা গিয়াছেন ২৫০ জন। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে বজ্রপাত বাড়িয়াছে ১৫ শতাংশ। সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে বেশি বজ্রপাত হইয়া থাকে এবং ইহা চলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে এইবার অক্টোবর পর্যন্ত বজ্রপাত হইতে থাকিবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। এই ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিশ্বে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য বজ্রপাতপ্রবণ একটি দেশ হিসাবে পরিচিত। বিশ্বে যত বজ্রপাত হয়, তাহার এক-তৃতীয়াংশ হয় আমাদের এই বাংলাদেশেই; কিন্তু ইহাকে আমরা এখনো গুরুত্ব দিয়া ইহা হইতে পরিত্রাণের কথা চিন্তা করিতেছি না। বজ্রপাত বৃদ্ধির সহিত বিশ্ব উষ্ণতা বা জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাবের সম্পর্ক রহিয়াছে। ইহা ছাড়া নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, বাড়ির দুর্বল অবকাঠামো, তালগাছসহ উঁচু উঁচু গাছের অভাব ইত্যাদিও ইহার জন্য দায়ী। বজ্রপাত আগেও হইত; কিন্তু বর্তমানে বন্যার চাইতেও আমাদের দেশে ইহা একটি বড়ো দুর্যোগের রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে।

এক পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, বাংলাদেশে ২০১৫ সালে ২৭৪, ২০১৬ সালে ৩৮৭, ২০১৭ সালে ৩৭২ এবং ২০১৮ সালে ৪৪৯ জন মানুষ প্রাণ হারাইয়াছে বজ্রপাতে। এই বত্সর প্রতিনিয়ত মৃত্যুর হার বাড়িতেছে। জনসংখ্যা বাড়িবার কারণেও এখন অধিক মৃত্যুর খবর আসিতেছে। বজ্রপাতে সর্বাধিক মৃত্যু হইয়া থাকে কৃষকের জমিতে কাজ করিবার সময়। আগে কৃষিজমির ফাঁকে ফাঁকে তালগাছ, খেজুরগাছসহ বড়ো বড়ো গাছ দেখা যাইত। এখন দেখা যায় কদাচিত। নারিকেল, সুপারি, বট প্রভৃতি গাছের সংখ্যাও কমিতেছে। আবার বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা না থাকা, কৃষিতে ধাতব যন্ত্রপাতি ও আধুনিককালে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বজ্রপাতের আশঙ্কা সম্পর্কে কার্যকর সতর্কবার্তার অভাব ইত্যাদি কারণেও বাড়িতেছে বজ্রপাতের হার। বজ্রপাতের সাম্প্রতিক ঘটনা বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, তিন শ্রেণির মানুষ অধিক হারে বজ্রপাতের শিকার হইয়া থাকেন। তাহারা হইলেন কৃষক, রাখাল ও ব্যবসায়ী। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে অধিকাংশ মানুষ আছেন হোম কোয়ারেন্টাইনে; কিন্তু এই তিন শ্রেণির মানুষকে কাজের প্রকৃতিগত কারণেই বাহিরে থাকিতে হয় বলিয়া তাহারা অধিক ঝুঁকিতে রহিয়াছেন। কৃষকরা ঝড়বৃষ্টি লইয়া মাঠেঘাটে কাজ করেন এবং বজ্রপাতের সহজ শিকার হন।

বিজ্ঞানীদের মতে, বর্ষা আসিবার পূর্বে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়িয়া গেলে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর হইতে ভাসিয়া আসা আর্দ্র বায়ুর সহিত উত্তরে হিমালয় হইতে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে সৃষ্টি হয় বজ্রমেঘ, বজ্রঝড় ও বজ্রপাত। এই সময় আমাদের অসচেতনতায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। এই জন্য এই ব্যাপারে আমাদের গবেষণা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সাফল্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। তবে বজ্রপাতের ক্ষেত্রে আমরা পিছাইয়া থাকিব কেন? ইহাতে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে কৃষিজমির ফাঁকে ফাঁকে তাল ও খেজুরগাছ রোপণ, কমিউনিটি রেডিওয়ের মাধ্যমে বজ্রপাতের সতর্কবার্তা ঘনঘন প্রচার এবং বজ্রপাতনিরোধক যন্ত্র তথা আর্থিংয়ের ব্যবস্থা করা একান্ত আবশ্যক।