সচেতন হতে হবে সারা জীবনের জন্য

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা শুনলে হয়তো ভীষণ অবাক হবে যে, গত রাতে তোমরা যখন ঘুমাচ্ছিলে ঠিক তখন পরিস্থান থেকে এক রাজকুমার পঙ্খিরাজে চড়ে তোমার জানালায় উঁকি দিয়ে গেছে। সে  তোমাদের কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তোমরা ঘুমিয়ে ছিলে বলে কিছুই বলতে পারেনি। এটা শুনে মন খারাপ করো না কিন্তু। রাজকুমার জানে তোমাদের এমন এক বন্ধু আছে যাকে কিছু বলে দিলেই সে তোমাদের জানিয়ে দেবে। সেই বন্ধুটি হলো কচি-কাঁচার আসর। সেই পরিস্থানের রাজকুমার কচি-কাঁচার আসরে তোমাদের জন্য অনেক কথা বলে গেছে। সে কিন্তু জানে তোমাদের মন খারাপ তারপরও সে এসেছিল তোমাদের ভালোবাসা দিতে।

তোমরা তো জানো চিরচেনা সেই ব্যস্ত পৃথিবী মরুভূমির মতো বিরান অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। করোনা ভাইরাসের কারণে গোটা পৃথিবীর চাকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।বাদ পড়েনি বাংলাদেশও। স্কুল কলেজ, অফিস আদালত সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বিশ্বের অনেক দেশেই লকডাউন শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও অবশেষে লকডাউন ব্যবস্থায় শিথিলতা এনেছে। তবে কচি-কাঁচার আসরের মাধ্যমে সেই অপূর্ব রাজকুমার সারাদেশের সব ছোট্ট বন্ধুদের বলে গেছে বিপদ এখনো কাটেনি। তোমাদের সবাইকে কিন্তু আরো  অনেক বেশি সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। লকডাউন তুলে দিয়েছে তার মানে এই নয় যে এখন আর আমাদের সচেতন থাকার দরকার নেই। বরং এখন ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।  

রাজকুমার জানে তোমরা যারা বয়সে ছোট তোমাদের মনটা পাখির মতো, প্রজাপতির মতো। তোমরা তোমাদের অদৃশ্য রঙিন ডানা মেলে মুক্ত বাতাসে উড়তে চাও। কিন্তু মহামারি করোনা তোমাদেরকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। একটা সময় যে তুমি মনে করতে স্কুল ছুটি হলে কতই না মজা হবে, সেই তুমিই হয়তো আজ অনেকদিন স্কুলে যেতে না পেরে, খেলতে না পেরে হাহুতাশ করছ। তোমাদের সময়টাকে আরো খানিকটা আনন্দঘন করতে তোমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে পারো। যেহেতু ঝুঁকি আরো অনেকদিন থাকবে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন তাই অভ্যাসগুলো ঠিক রাখতে হবে। যারা স্বাস্থ্যসচেতনতা শিখে নিয়েছ তারা সেভাবেই তা পালন করবে, পাশাপাশি যারা এখনো শেখেনি তাদেরকেও শেখাতে হবে। প্রথমে শেখানো হবে কীভাবে হাত ধুতে হবে, কীভাবে মাস্ক পরতে হবে, কীভাবে হ্যান্ড গ্লাভস পরতে হবে। হাঁচি-কাশি দেওয়ার নিয়মগুলো শিখতে হবে।

আমাদের এক ছোট্ট বন্ধু সিজদা টিভিতে দেখিয়েছিল কীভাবে হাত ধুতে হয়। হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে পরিষ্কার পানিতে হাত প্রথমে ভিজিয়ে নিয়ে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাতের আঙুলে ফেনা করতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন ফেনা হাতের পেছনের দিকে এবং আঙুলের ফাঁক ও নিচ পর্যন্ত পৌঁছায়।অন্তত বিশ সেকেন্ড দুই হাত ভালোভাবে ঘষে ধুতে হবে।মজা করার জন্য হাত ধুতে ধুতে তুমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ গানটি গাইতে পারো আর নিজেকে উইশ করতে পারো। তুমি ভাবছ আজ তো তোমার জন্মদিন না তাহলে কেন এই গান গাইবে? আরে মজা করার জন্য গাইবে। দরকার বলে বাড়ির বড়োদেরকেও সাথে নিও, তাহলে তারাও মজা পাবে। হাত ধোয়ার পর পরিষ্কার তোয়ালে বা টিস্যু দিয়ে হাত মুছে ফেলতে হবে। 

তোমাদের এক ছোট্ট বন্ধু রিহান বলেছে, হাঁচি-কাশির সময় হাতের বাহুর অংশ দিয়ে মুখ ঢাকতে হবে অথবা টিস্যু ব্যবহার করতে হবে। মুখে মাস্ক পরতে হবে। হাতে গ্লাভস পরতে হবে। ওর কথার সাথে সুর মিলিয়ে আদিব আহমেদ শান বলেছে, চোখে, নাকে হাত দেওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। আর বাসার বাইরে তো যাওয়াই যাবে না।

তোমরা কিন্তু অনেক কিছু জানো, যা অনেক বড়োরাও জানে না। তোমাদেরও নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে এটা মনে হয় যে বড়োরা কিচ্ছু জানে না। এই সময়ে যেহেতু তোমরাও গৃহবন্দি তারাও গৃহবন্দি তাই তুমি হয়ে যেতে পারো টিচার। বাসার বড়োদের তুমি অনেক কিছু শেখাতে পারো। আর তোমাকে সাহায্য করার জন্য তো তোমার বন্ধু গুগল আছেই। যা জানতে চাইবে সে সাথে সাথে তোমাকে জানিয়ে দেবে।

গুগল থেকে শিক্ষণীয় নানা ধরনের পাজল গেম বের করতে পারো এবং সবাই মিলে তার সমাধান করতে পারলে খুব আনন্দের সঙ্গে সময় কাটবে। তোমরা যারা সারা জীবন টিভিতে অভিনয় দেখেছ-এই ছুটিতে নিজেরাই ঘরে বসে নানা রকম অভিনয় করতে পারো এবং সেটা মোবাইলের ক্যামেরায় ভিডিও করে শেয়ার করার মাধ্যমে অন্যদের আনন্দ দিতে পারো। কিচেনে আম্মু রান্না করেন, তুমি মজা করে খাও। এই সময়ে আম্মুর পাশে থেকে দেখতে পারো কীভাবে আম্মু মজার রান্না করেন। আব্বু-আম্মুর কাছ থেকে তাদের ছোটবেলার গল্প শুনতে পারো। রং-তুলি নিয়ে বসে ছবি আঁকতে পারো। যেকোনো একজনকে তোমার মডেল বানিয়ে তার ছবিও আঁকতে পারো! ক্লাসের পড়ার চাপে যে সব গল্পের বই তুমি পড়তে পারোনি সেগুলো পড়তে পারো আবার পছন্দের সিনেমাও দেখতে পারো।যারা অনেক আগে রুবিক্স কিউব কিনে রেখেছ, কিন্তু সময়ের অভাবে শিখতে পারোনি এই সময়ে ইউটিউবের ভিডিও দেখে শিখে নিতে পারো। কোনো কিছুই ভালো লাগছে না? ইচ্ছে করছে মন খুলে কান্নাকাটি করতে? তবে মন খুলে কাঁদো আর কেউ যদি তোমার সেই কান্নার ভিডিও ফেসবুকে দিয়ে দেয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই-রাতারাতি তোমাকে চিনে ফেলবে সবাই!

তবে হ্যাঁ, যত কিছুই করো না কেন-একটা কথা মনে রাখতে হবে, অন্যান্য ক্ষেত্রে লকডাউন তুলে নিলেও স্কুল এখনো বন্ধ আছে। তার মানে এই নয় যে আর কোনোদিন স্কুলে যেতে হবে না। স্কুল কিন্তু একদিন না একদিন খুলবেই। সুতরাং ক্লাসের পড়াটাও রেডি করে রেখো। তাহলে পরীক্ষায় তুমি আগের মতোই ভালো রেজাল্ট ধরে রাখতে পারবে। তোমার আইকিউ কেমন সেটাও পরীক্ষা করে দেখতে পারো। সামনে ঈদ, পূজা। তোমরা চাইলে বন্ধুদের জন্য নিজের মতো করে কার্ড তৈরি করতে পারো। ফাইভ মিনিটস ক্র্যাফট দেখে আরো অনেক কিছু শিখতে পারো। এমনকি চাইলে নিজেই একটা আস্ত বই লিখে ফেলতে পারো। করোনা ভাইরাসের সময় ঘরে বন্দি থেকে তোমার কেমন লাগছে, তুমি কী করেছ এই সময়ে-সব লিখে রাখতে পারো। বলা তো যায় না হতে পারে সেই লেখাটাই তোমাকে লেখক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবে। কচি-কাঁচার আসরের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য অনেক দোয়া ও ভালোবাসা। সাবধানে থাকো, নিরাপদে থাকো আর আনন্দে থাকো। দেখবে একদিন আবার সুদিন আসবে। তোমরা আবার ফিরে পাবে মুক্ত হাওয়ায় ঘুরে বেড়ানোর  স্বাধীনতা। এবং সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করো যেন তোমরা বড়ো হয়ে এমন সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারো যেন আগামীর বিশ্বে কোনো মহামারি আঘাত হানতে না পারে এবং যদি আঘাত হানে তবুও যেন তা খুব সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণায় তোমরা নজির স্থাপন করবে যা আগামীর বিশ্বকে আরো নিরাপদ করে তুলবে।

ইত্তেফাক/আরএ