জোনভিত্তিক এই বিশেষ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব

লকডাউন অত্যন্ত তিতা ঔষধ। ইহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও অধিক। লকডাউনের কারণেই সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মহামন্দা দেখা দিয়াছে। লকডাউন জীবন বাঁচাইতে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে বটে। তবে ইহা জীবিকার উপরও ভয়াবহ আঘাত হানে। জীবন ও জীবিকা রক্ষার এক ভয়ংকর টানাপোড়েন তৈরি করে লকডাউন। যেই কারণে সারা বিশ্বই বিবিধ স্বাস্থ্যবিধি জারি করিয়া লকডাউন শিথিল করিতে বাধ্য হইতেছে। বাংলাদেশেও সাধারণ ছুটি এবং বিশেষ ক্ষেত্রে লকডাউন সীমিত করিয়া সকল কিছু খুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। অর্থনীতি তো বাঁচাইতে হইবে।

কিন্তু ইতোমধ্যেই ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে যে, বাংলাদেশে সংক্রমণের গ্রাফ প্রতিদিনই আগের দিনের রেকর্ড ভাঙিয়া দিতেছে। গতকালও যেমন নূতন আক্রান্ত হইয়াছে ৩ হাজার ১৭১ জন। বলা যায়, এই প্রথম এক দিনে ৩ হাজারের কোটায় পা রাখিল বাংলাদেশ। দিন যত যাইবে ততই এই সংক্রমণের কোটা ৩ হাজার হইতে ৪ হাজার, ৫ হাজার, ৬ হাজার করিয়া লাফাইয়া লাফাইয়া বাড়িতে থাকিবে। ইহা লইয়া কাহারো খুব বেশি দ্বিমত নাই যে, করোনাকে সঙ্গী করিয়াই আমাদের জীবন ও জীবিকা বাঁচাইতে হইবে। এই কারণে কোনো এলাকা যদি অধিক মাত্রায় সংক্রমিত হয়, তাহা হইলে ঐ এলাকাকে বিশেষ নিয়ন্ত্রণে লইয়া লাল এবং সংক্রমণের মাত্রা অনুযায়ী হলুদ ও সবুজ জোন করাটা বিশেষ কার্যকরী পন্থা। এই ক্ষেত্রে লাল জোনকে চিহ্নিত করিয়া এলাকাবিশেষে লকডাউন জারি রাখিবার সিদ্ধান্তটিও গুরুত্বপূর্ণ বটে। এই ‘বিশেষ নিয়ন্ত্রণ’ আরোপের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে সম্মতিও দিয়াছেন। ইহাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হইবে না, আবার সংক্রমণকেও বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যাইবে। বিশ্বব্যাপী লকডাউন স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেকের প্রাণ বাঁচাইয়াছে। লন্ডনের ইমপিরিয়াল কলেজের এক গবেষণায় বলা হইয়াছে যে, লকডাউন জারির কারণে ইউরোপে ৩১ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা পাইয়াছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক গবেষণায় বলা হইয়াছে—চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে লকডাউনের কারণে অন্তত ৫৩ কোটি মানুষের সংক্রমণ এড়ানো গিয়াছে।

তবে, করোনাকে প্রতিহত করিতে দিনের পর দিন ধরিয়া ব্যাপক লকডাউন আমাদের মতো ঘনবসতির দেশগুলির জন্য খুব বেশি দিন চালানো সম্ভব নহে। কারণ, তাহাতে করোনার চাইতেও অর্থনৈতিক কারণে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটিবে। আসলে, লকডাউনের মাধ্যমে আমরা কেবল ‘বাড়তি সময়’ পাই করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার। সুতরাং লকডাউনের কড়া ঔষধটির মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘সময়’ কাজে লাগাইতে হইবে। অর্থাত্ করোনা চিকিত্সার জন্য বৃহত্তর ক্ষেত্র প্রস্তুত করিতে হইবে। করোনা পরীক্ষার ব্যাপক সুযোগ, হাসপাতালের শয্যা ও আইসিইউর সংখ্যা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত এবং চিকিত্সক-নার্সদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিতে হইবে। অর্থাত্ আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা সবল করিতে হইবে। গত ছয় মাসে আমরা এই রোগের চিকিত্সা-সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক কিছু জানিয়াছি। এখন অনেক জটিল রোগীকে বা জটিল অবস্থাকে আমরা মোকাবিলা করিতে পারিতেছি। অর্থাত্ যত বেশি ‘সময়’ হাতে পাওয়া যাইবে ততই আমরা এই নূতন রোগটিকে জানিতে পারিব। সুতরাং জোনভিত্তিক এই বিশেষ নিয়ন্ত্রণে সময়ক্ষেপণ করা যাইবে না।