মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ
করোনা (COVID-19) বিশ্বের ধনী দরিদ্র সকল দেশকেই ফেলে দিয়েছে জীবন জীবিকার কঠিন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে। বিশ্বের তাবদ অর্থনীতি, জীবনযাত্রা, সামাজিকতা, শিক্ষা, ব্যবসা বাণিজ্য সবক্ষেত্রকে এক অদৃশ্য ভাইরাস আজ তছনছ করে ক্রমাগত থাবা বিস্তার করে চলেছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে—এর প্রতিষেধক টিকা বা কার্যকরি ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আছে চরম অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে। এ বাস্তবতায় আগামী বাজেট প্রণয়ন সরকারের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি, শিল্প, সেবা সবক্ষেত্রই যাচ্ছে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিটেন্স, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সৃজনশীল উদ্ভাবন এবং গার্মেন্টসসহ ব্যবসাবান্ধব পরিস্থিতির উন্নতি করা ও চিকিত্সাসুবিধা নিশ্চিত করে জনগণকে রক্ষা করাই সরকারের জরুরি করণীয়।
অর্থবিভাগের এক প্রক্ষেপণ (Projection) অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে এউচ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮.২০ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮.৩০ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮.৪ শতাংশ।
রাজস্ব টার্গেট
অর্থবছর মোট রাজস্ব টার্গেট কর রাজস্ব টার্গেট
২০২০-২১ ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা
২০২১-২২ ৪ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা ৩ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা
২০২২-২৩ ৪ লাখ ৯২.৭ হাজার কোটি টাকা ৪ লাখ ৯২.৭ হাজার কোটি টাকা
অর্থবছর রপ্তানি আমদানি
২০২০-২১ ৪১.৯৫ বিলিয়ন ডলার ৫৪.৮৮ বিলিয়ন ডলার
২০২১-২২ ৪৬.৪৮ বিলিয়ন ডলার ৫৯.২৮ বিলিয়ন ডলার
২০২২-২৩ ৫১.৫৭ বিলিয়ন ডলার ৬৩.৪২ বিলিয়ন ডলার
২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা যা চলতি বছরের চেয়ে ৪৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা বেশি। রাজস্ব ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। যা জিডিপির (এউচ) প্রায় ৫.৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে আদর্শ ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। এই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারকে মূলত নির্ভর করতে হবে ব্যাংক ঋণের ওপর। অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ ১ লাখ ৯ হাজার এবং বৈদেশিক ঋণ ৭৬ হাজার কোটি টাকার ঊর্ধ্বে। অথচ চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ছিল ৫২ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। অর্থাত্ আগামী অর্থবছরে বাজেটে বৈদেশিক ঋণের নির্ভরতা বাড়ছে।
করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ প্রস্তাবনা দিয়ে বাজেট প্রস্তুত করা বাঞ্ছনীয়। চলতি বছরের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে এ বছর স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ২৫ হাজার ৭২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ৫ হাজার ৭৭৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আরো ১০ হাজার কোটি টাকা থোপ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, বড়ো বাজেট করলেই চলবে না। প্রয়োজন হবে বাজেটের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয়ের সক্ষমতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও বৃদ্ধি পাইনি বাস্তবায়ন সক্ষমতা বা গতি। মূল বাজেটকে অনেক কাটছাঁট করে প্রস্তুত করা হয় সংশোধিত বাজেট আর সে ক্ষেত্রেও বাস্তবায়নের হার ৭০ শতাংশের নিচে। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক দক্ষতা ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে।
সরকার যখন প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ ওপরে ধরে প্রজেকশন (Projection) করেছে তখন আই এম এফ (IMF) বলেছে প্রবৃদ্ধি ৩.৫০ শতাংশের মধ্যে থাকবে। সি পি ডি (CPD) বলেছে প্রবৃদ্ধি হবে ২.৫ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার অধিক হবে না। শুধু মে ২০২০ মাসে রপ্তানি কমেছে ৬৮.৩৪ শতাংশ । তাই অর্থবিভাগের প্রদর্শিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এর বিপরীত চিত্র হচ্ছে সবকিছুর পরেও আই এম এফ (IMF) এর ঋণসহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার (যা সর্বোচ্চ রেকর্ড)। বাংলাদেশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দেশ ঋণ দিতে পিছপা হয় না কারণ বাংলাদেশ কখনো ঋণ খেলাপি হয়নি। চীন থেকে যেসব জাপানি বিনিয়োগ বের হয়ে আসছে সেটা বাংলাদেশের কাজে লাগাতে পারলে একটি নতুন সম্ভাবনা থাকবে।
প্রবৃদ্ধি কি হবে সেটা নিয়ে এখন ভাবার বিষয় নয়। এখন মূল ভাবনার বিষয় হচ্ছে—মানুষের জীবন ও জীবিকার সমন্বয় করে বৃহত্তর অর্থনীতির স্বার্থে কীভাবে লকডাউন পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে বের হয়ে আসা যায়। অর্থনীতির গতি ফেরাতে পণ্যের চাহিদা ও জোগানের সাপ্লাই চেইন স্বাভাবিক রাখতে হবে। করোনার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি কি হতে পারে তার প্রজেকশন (Projection) থেকে বাস্তব পরিকল্পনা করতে হবে। তেলের দাম কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে অনেক পরিবর্তন হবে (যেখানে আমাদের মূল রেমিট্যান্সের স্থল)। তাই মধ্যপ্রাচ্য থেকে শ্রমিক ফেরত আসলে যে সামাজিক চাপ বাড়বে তা মোকাবিলা এবং প্রতিবছর শ্রমবাজারে যে ২০ থেকে ২২ লাখ শ্রমিক যুক্ত হয় তাদেরকে বিকল্প বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে নাহলে সামাজিক চাপ বাড়বে এবং অর্থনীতিও দুর্বল হয়ে পড়বে। পোশাক শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের ধারণা বাস্তবায়িত হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বড়ো চ্যালেঞ্জও হবে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে। সিপিডি (CPD) এ বিষয়ে তাদের একটি প্রজেকশন (Projection) এ দারিদ্র্যের হার ২৪ থেকে ৩৫ এ উন্নীত হওয়ার কথা বলেছে।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিগত ১০০ বছরে এত বড়ো বিপদ আসেনি। এই ভাইরাস সারা বিশ্বের জীবন জীবিকা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড সবই এলোমেলো করে দিয়েছে। উন্নত বিশ্ব নিজেদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে।
এ বাস্তবতায় আমাদের এ করোনা মহামারিতে বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে : ০১। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ০২। ত্রাণ ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় ০৩। কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের ব্যবস্থাপনা ০৪। রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা ০৫। জরুরি সেবা নিশ্চিতকরণ ০৬। উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ০৭। আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও আঞ্চলিক সহযোগিতা ০৮। আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক সমন্বয়।
উল্লেখিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বাজেটে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। বাজেটে যে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে তা হচ্ছে—কোথায় অর্থ খরচ করা হবে আর সেই অর্থ আসবে কোথা থেকে অর্থাত্ করোনার এই মহামারিতে খরচ ও জোগানের অগ্রাধিকার ঠিক করাই বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। করোনার এই মহামারি সময় এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্যান্য কৌশলের সঙ্গে বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণ এবং বিদেশে ফ্লাই (প্রাচার) করে চলে যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে বিনা প্রশ্নে যে কোনো খাতে বিনিয়োগের সুবিধা হতে পারে একটি বিশেষ কৌশল।
n লেখক : সাবেক সচিব ও যুগ্ম আহ্বায়ক, সম্প্রীতি বাংলাদেশ