শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিনের কথা

ড. মিল্টন বিশ্বাস

১১ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারা মুক্তি দিবস। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে ধানমন্ডির নিজ বাসভবন সুধাসদন থেকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করে। প্রায় ১১ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১/১১-এর অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুগত ব্যক্তিদের দেওয়া মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করলেও, শেখ হাসিনা পরবর্তীকালে সেই অভিযোগ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অব্যাহতি পেয়েছেন।

আসলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে খুন করার সময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া দুই কন্যার সংগ্রামী জীবনে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে দুঃখের কষ্টিপাথরে সহিষ্ণুতার দীক্ষায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন ২০০৭ সালে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়ে। ’৭৫ থেকে ’৯৫ দীর্ঘ ২১ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি হন প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তারপর ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অমানিশার দুর্যোগে প্রাণ বাঁচানোর দুঃসহ স্মৃতি; অর্থাত্ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া জীবন নিয়ে আবার নির্যাতিত জনগণের জন্য রাতদিনের পরিশ্রম—কিন্তু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর সময় হঠাত্ করে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কারাগারে বন্দি হলেন; শুরু হলো আরেক জীবন। সেই জীবনের স্মৃতি আছে তার রচনায়, ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ গ্রন্থে।

বঙ্গবন্ধুর ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেলজীবনে কারামুক্তি দিবস একাধিক হলেও আমরা ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারিকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে তার জেলজীবনের সমাপ্তি টেনে দিবসটিকে মুক্ত স্বদেশের মুক্তির বারতায় তার নিঃশ্বাস নেবার অন্যতম দিন হিসেবে চিহ্নিত করি। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার ২৭ বছরের বন্দি জীবনের সমাপ্তি ঘটে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, ওই দিন তার কারামুক্তি দিবস। বঙ্গবন্ধু ও ম্যান্ডেলা উভয়েই নিপীড়ক শাসকের কারা প্রকোষ্ঠে দিনের পর দিন বন্দি থেকেও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির চিন্তায় নিবেদিত ছিলেন। অনুরূপভাবে শেখ হাসিনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসকদের দ্বারা মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও কারাযন্ত্রণার শিকার হয়েছিলেন দুর্ভাগ্যবশত। শেখ হাসিনাকে প্রাণনাশের একাধিকবার চেষ্টা চলেছে ১৯৮১ সালের ১৭ মে’র পর থেকেই, যা ২০২০ পর্যন্ত ২১ বার বলে তথ্যপ্রমাণ সাক্ষ্য দেয়। এমনকি সাব জেলে থাকার সময় স্লো পয়জনিংয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। গ্রেফতারের পর তাকে রাখা হয় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাব জেলে। সেখানে তার খাবারে ক্রমাগত পয়জন দিয়ে তাকে মেরে ফেলার টার্গেট করা হয়। স্লো পয়জনিংয়ের কারণে বন্দি শেখ হাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সবই ছিল তাকে এ দেশের রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র। এজন্য ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর তার দেশে ফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। উদ্দীপিত হয় দলীয় নেতাকর্মীরা। যৌথবাহিনী তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করার পর গণমানুষ তার অনুপস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিল। সেসময় তার সাব জেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্বেগ, গ্রেফতারের সংবাদ শুনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চার জনের মৃত্যুবরণ, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের উত্কণ্ঠা আপামর জনগোষ্ঠীকে বদলে দিয়েছিল। কারণ, তখন আদালতের চৌকাঠে শেখ হাসিনা ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা; দেশ ও মানুষের জন্য উত্কণ্ঠিত; বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে সত্য কথা উচ্চারণে বড়ো বেশি সপ্রতিভ।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল চাঁদাবাজির। অথচ ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতাকালে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের হলেও কখনো চাঁদাবাজির মামলা করা হয়নি। এজন্য আমাদের মনে হয়েছে, মামলাবাজ জোট সরকার থেকেও বড়ো আবিষ্কারক ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার জন্য শেখ হাসিনা আন্দোলন করেছিলেন। ৬৮ জন মানুষ জীবন দিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী ও পুলিশ বাহিনীর হাতে। সেই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। যে নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। চারদলীয় জোটের ভোট কারচুপির নীলনকশা প্রতিহত করার জন্যই আন্দোলন করেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা। জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা করে গণতন্ত্রকে সুসংহত করাও তার মূল টার্গেট ছিল। নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। তার ভাষায়—‘আন্দোলন করে দাবি পূরণ করলাম, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করলাম। যেই দ্রুত নির্বাচনের কথা বললাম, সেই আমি চাঁদাবাজ হয়ে গেলাম, দুর্নীতিবাজ হয়ে গেলাম। আমার স্থান হলো কারাগারে। পাঁচটি বছর চারদলীয় জোট তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে আমার ও আমার পরিবারের দুর্নীতির কোনো কিছু পায় কি না, পায় নাই। পেয়েছে ফখরুদ্দীন সরকার।’

n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়