চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা রোগীর ভিড় ক্রমশই বাড়ছে। এসব রোগীকে জরুরিভিত্তিতে অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন পড়লেও করোনা সন্দেহে তাদেরকে কোনো হাসপাতালেই ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। আইসিইউ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের। পুরো চট্টগ্রামের জন্য মাত্র ২০টি আইসিইউ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে জরুরি চিকিত্সা না পেয়ে একের পর এক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীতে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ অন্তত চার জন তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। মৃতদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, তারা বিভিন্ন হাসপাতালে ধরনা দিলেও আইসিইউ না থাকার অজুহাত দেখিয়ে কোথাও রোগীকে ভর্তি নেয়নি। অবশেষে বিনা চিকিত্সায় রোগীরা মারা যায়। আইসিইউ সংখ্যা আরো বাড়ানো না হলে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, আইসিইউ না পেয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফাতেমা আক্তার মুক্তা নামে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট এলাকার বাসিন্দা ঐ নারীকে গত মঙ্গলবার প্রথমে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিত্সা না পাওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অক্সিজেন সাপোর্ট পেলেও আইসিইউ না পাওয়ায় তিনি মারা যান। তার স্বামী তৌহিদুল আনোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, মঙ্গলবার সকালে আমার মুমূর্ষু স্ত্রীকে নিয়ে মা ও শিশু হাসপাতালে গেলাম। সেখানে বিকাল চারটা পর্যন্ত ছিলাম। ঐ সময় আমার স্ত্রীকে আইসিইউ সুবিধা দিতে চিকিত্সকের পায়ে ধরেছি। বলেছি এক ঘণ্টার জন্য হলেও আইসিইউ দেন। যদি অবস্থা স্থিতিশীল হয় তখন ছেড়ে দেব। কিন্তু কারো মন গলাতে পারলাম না। পরে সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাই। সেখানে করোনা ইউনিটে ভর্তি করানোর পর অক্সিজেন দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে চিকিত্সকরা আইসিইউ লাগবে বলে জানান। তবে চমেকেও আইসিইউ বেড খালি নেই বলে জানানো হয়। অবশেষে রাত পৌনে চারটার দিকে আমার স্ত্রী মারা গেছেন। কী পরিমাণ কষ্ট গেছে তা বোঝানো সম্ভব না।
এ ব্যাপারে চমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আফতাবুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের সব আইসিইউতে রোগী ভর্তি ছিল। এক জন রোগীকে বের করে দিয়ে অন্য রোগী রাখার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইসিইউ সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।
নগরীতে কোথাও আইসিইউ না পেয়ে গতকাল মারা গেছেন প্রীতি বিকাশ দত্ত নামে ৬২ বছর বয়সি এক বৃদ্ধ। তার ছেলে অভিজিত্ জানান, বুধবার রাতে হঠাত্ বাবার বুকে ব্যথা শুরু হয়। অসুস্থ বাবাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে মা-মনি হাসপাতাল, ম্যাক্স, ন্যাশনাল হাসপাতাল ঘুরেও মিলেনি চিকিত্সা। পরে বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পরই বাবা মারা যান।
নগরীর চারটি হাসপাতাল ঘুরে পঞ্চম হাসপাতালে ভর্তি হতে পারলেও সেখানে অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সহসভাপতি লায়ন মো. কামালউদ্দিন। গতকাল ভোরে তিনি পাঁচলাইশের ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে মারা যান। নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, কামালউদ্দিনের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় মা ও শিশু হাসপাতালে। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা বসেছিলেন তিনি। এরপরও অক্সিজেন মেলেনি। এরপর পার্কভিউ, ম্যাক্স ও মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে গেলেও কোথাও করোনা সন্দেহে ভর্তি নেয়নি। ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে যখন আনা হয় তখন তার অক্সিজেন নেমে গিয়েছিল ৭৮-এ। তখন তার আইসিইউ সাপোর্ট লাগতো। কিন্তু হাসপাতালে তিনটি আইসিইউ শয্যার সবগুলোতেই রোগী ভর্তি ছিল। কামালউদ্দিনের মৃত্যুতে নগর বিএনপির নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন।
মৃত্যুর আগে নগরীর বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি হতে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের চৌধুরীর পিতা জসিম চৌধুরীকে। সেখান থেকে চমেক হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথেই তিনি মারা যান। জোবায়ের চৌধুরী জানান, রাত আড়াইটার দিকে বাবার মাথার এক পাশে ব্যথা ওঠে। ডান হাত অবশ হয়ে যায়। আমি তখনই ন্যাশনাল হাসপাতালের ল্যান্ড ফোনে কল করি। বাবার পরিস্থিতি জানাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে বলে, আপনি রোগী নিয়ে আসেন। আমরা ভর্তি করব। কিন্তু বাবাকে নিয়ে আসার পর তারা গাড়ি থেকেই নামাল না।