রাজধানীর গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাসপাতালটির তিন ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী এই মামলার তদন্ত কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া মামলার তদন্ত কাজে ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির রিপোর্টও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গুলশান থানার ওসি কামরুজ্জামান।
গত ২৭ মে ঐ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্তের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এসপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) আব্দুল আহাদকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অপর দুই সদস্য হলেন সহকারী কমিশনার (গুলশান) রফিকুল ইসলাম ও গুলশান থানার ওসি কামরুজ্জামান। তদন্ত কমিটি গতকাল ডিএমপি সদর দপ্তরে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে তিন ধরনের গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে।
প্রথম গাফিলতি : করোনা সেন্টারে প্রবেশমুখে বর্ধিত আকারে মেডিক্যাল তাঁবু স্থাপন করা ছিল। এ তাঁবুতে চিকিত্সক ও নার্সদের ডেস্ক। তাঁবু দিয়ে করোনা ইউনিটে প্রবেশ করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী স্থাপিত তাঁবুটি অদাহ্য হতে হবে। কিন্তু সেখানে সাধারণ মানের দাহ্য তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিল। ঐ তাঁবুতে পুরাতন এসি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এছাড়া ঐ স্থাপনার ক্ষেত্রে রাজউকের কোনো অনুমোদনও ছিল না।
দ্বিতীয় গাফিলতি : তাঁবুর এসিতে আগুন ধরে যাওয়ার পর ক্লিনার আরাফাত মেঝে পরিষ্কার করার লাঠিযুক্ত সুতার ঝাড়ু দিয়ে এসির আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ঝাড়ু স্যানিটাইজ জাতীয় তরলে ভেজা ছিল বলে সেটি এসির কাছে নিয়ে যেতেই আগুনের মাত্রা বেড়ে যায়। এ সময় আরাফাত চেষ্টা করতে থাকে আগুন নেভাতে। এসব দেখে কর্তব্যরত এক জন চিকিত্সক সেখান থেকে পালিয়ে যান। ডেস্কে কর্মরত দুই জন নার্স অনবরত ফোন করে আগুনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে থাকেন। এসির আগুন নিচে একটি বেডের ওপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন বিশাল আকার ধারণ করে। ঐ সময় আগুনের ধোঁয়া তাঁবুর দরজা দিয়ে করোনা ইউনিটে প্রবেশ করে। ঐ সময় ইচ্ছা করলে ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে সহজে আগুন নিভিয়ে ফেলা যেত। কিন্তু মেডিক্যাল তাঁবুতে কোনো ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল না। সেখানে অনেক দাহ্য পদার্থ থাকায় ন্যূনতম দুইটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখা উচিত ছিল।
তৃতীয় গাফিলতি : করোনা ইউনিটে মোট দুইটি কক্ষ। একটি কক্ষে পাঁচ জন রোগী ছিলেন। পাশেই একটি কক্ষ ছিল যেটার বাইরের দরজা দিয়ে ঐ কক্ষের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। আগুন তাঁবুতে লাগার পর ছড়িয়ে পড়ার আগেই করোনা ইউনিটে দায়িত্বরত নার্স ও অ্যাটেনডেন্সরা ইচ্ছা করলে পাশের কক্ষ দিয়ে ঢুকে রোগীদের সহজেই উদ্ধার করতে পারতেন। করোনা ইউনিটে বহির্গমন দরজা ছিল। সেটিও তারা ব্যবহার করেনি। তাঁবুতে আগুন ধরে যাওয়ার পর সেই ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে ঐ পাঁচ রোগী মারা যান।
এসব বিষয় নিয়ে গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত এক রোগীর আত্মীয়র দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। মামলা তদন্তে আমরা ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিত্সক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৩৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তদন্ত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
ফায়ার সার্ভিসের রিপোর্টে অবহেলার অভিযোগ
অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটি। তারা বলছে, ফায়ার সনদ ছাড়া বসানো ঐ করোনা ইউনিটে অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম ছিল না। রাখা হয়নি আগুনের সময় জরুরি নির্গমন পথ। ত্রুটিপূর্ণ জেনেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পুরোনো মেশিন বসানো হয়েছে করোনা ইউনিটে। অগ্নিনির্বাপণের জন্য রাখা ফায়ার এক্সটিংগুইশারগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল।
তদন্ত কমিটির প্রধান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক (ঢাকা) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, আমরা অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির বিবরণ এবং একই সঙ্গে প্রতিকারের সুপারিশ করেছি। ভস্মীভূত করোনা ইউনিটটি অস্থায়ীভাবে তৈরি করা ছিল। আগুন যখন লেগেছে তাত্ক্ষণিকভাবে একসঙ্গে পুরোটায় লেগে যায়। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে সবাই বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। আগুন লাগার সময় রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়নি।
গত ২৭ মে রাতে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডে রিয়াজুল আলম (৪৫), খাদেজা বেগম (৭০), অ্যান্থনি পল (৭৪), মো. মনির হোসেন (৭৫) ও মো. মাহাবুব এলাহী চৌধুরী হিরো (৫৭) নিহত হন। এ ঘটনার পর নিহত অ্যান্থনি পলের মেয়ের স্বামী রোনাল্ড নিকি গোমেজ বাদী হয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৩০৪(ক) ও ১০৯ ধারায় একটি মামলা করেন। মামলায় হাসপাতালের চেয়ারম্যান, এমডি, প্রধান নির্বাহী, পরিচালক, দায়িত্বরত ডাক্তার, নার্স ও সেফটি সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসামি করা হয়েছে।