ইতিহাস হইতে কেহ শিক্ষা না নিলেও ইতিহাস কাহাকেও ক্ষমা করে না। ক্লাইভের জন্মভূমি ব্রিটেনেরই মানুষ আজ বলিতেছেন—‘ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া ইজ দ্য সিম্বল অব কলোনিজম’। ‘ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া’ রবার্ট ক্লাইভের উপাধি। এই নামে পশ্চিম ইংল্যান্ডের শ্রেসবেরিতে তাহার একটি মূর্তি রহিয়াছে। ব্রিটেনের নাগরিকগণ এখন সেই মূর্তি অপসারণের দাবি তুলিয়াছেন। তাহাদের মতে, ইহা হইল উপনিবেশবাদের মূর্ত প্রতীক। এই ঘটনায় অনেকের মনে হইতে পারে পৃথিবী কি আজ উলটাপথে চলা শুরু করিল? যে রবার্ট ক্লাইভ ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতিষ্ঠাতা, যাহার লুণ্ঠনকৃত সোনাদানায় ব্রিটেনের চাকচিক্য বাড়িয়াছে, সেই ক্লাইভ আজ নিজ দেশেই আসামির কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান। ইহা ভাবিলেও আমাদের বিস্মিত হইতে হয়। কিন্তু আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর বর্ণবাদবিরোধী যে বিশ্ব আন্দোলন শুরু হইয়াছে, তাহার ঢেউ ইংল্যান্ডে লাগিবার পর ক্লাইভও এখন ধরাশায়ী হইবার পথে। ইহার আগে আমেরিকায় জেফারসন ডেভিস ও ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ভাস্কর্য ভাঙিয়া ফেলা হয়। ইরাক দখলের পর ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ভাস্কর্য ভাঙিয়া ফেলে আমেরিকা। আমেরিকার দেখানো সেই পথেই এখন হাঁটিতেছে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীরা।
কান্ট্রি কাউন্সিলের নিকট যাহারা ক্লাইভের মূর্তি সরানোর জন্য পিটিশন করিয়াছেন, তাহাদের দাবি ক্লাইভ ভারতীয়, বাঙালি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের জন্য অত্যাচারের প্রতীক। তাহার নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন হইয়াছে ভারতে। ব্রিটেনের সরকার কি সেই ‘গর্ব’ এখনো বহিয়া নিয়া যাইতে চাহে? ক্লাইভের ইতিহাস আসলে খুনের ইতিহাস। শঠতা ও লুটতরাজের ইতিহাস। তাহার আদেশে একটি জাতি প্রায় শেষ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই সেই রবার্ট ক্লাইভ, যাহার হাত ধরিয়া এবং মিরজাফর গংদের চক্রান্তে ২৩ জুন, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা। ইহার মাধ্যমে ভারতে প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হয়। কালক্রমে তাহা অন্তর্ভুক্ত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে। আড়াই শতকেরও বেশি সময় পর এখন ব্রিটিশদের বোধোদয় হইতেছে। প্রকৃতির কী নির্মম প্রতিশোধ! জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু আজ ইতিহাসের বাঁক বদল করিয়া দিতেছে। জর্জ ফ্লয়েড কোনো নেতা নন। একজন সাধারণ মার্কিন নাগরিক। কোনো দিক দিয়াই আমেরিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের সহিত তাহার তুলনা হয় না। অথচ তাহার মৃত্যুতে বিশ্ববর্ণবাদের ভিত আজ নড়িয়া উঠিয়াছে। জাগিয়া উঠিয়াছে বিশ্ববিবেক। আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও বিশ্বরাজনীতিতে এই ঘটনার প্রভাব হইতে পারে সুদূরপ্রসারী।
রবার্ট ক্লাইভের দ্বৈত শাসননীতি ও মুর্শিদাবাদের কোষাগার তছরুপ করিবার কারণে একসময়ের ঐশ্বর্যের বাংলায় নামিয়া আসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। ১৭৭৬ সালের এই দুর্ভিক্ষে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ লোকের করুণ মৃত্যু হয়। ক্লাইভ তাই চৌর্যবৃত্তি, শঠতা, ধূর্ততা, কূটকৌশল, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রাসাদষড়যন্ত্র, ডিভাইড অ্যান্ড রুল ইত্যাদিরও প্রতীক। ক্লাইভের জীবনী লেখক ম্যালকমের মতে, ক্লাইভ ছোটোকালে ছিলেন বখাটে ও মাস্তান। অনেক স্কুল হইতে বহিষ্কৃত কুখ্যাত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট লুটপাট-দুর্নীতির জন্য তদন্তে নামিলে একরাশ হতাশায় নিজের বাড়িতে নিজেকে গুলি করিয়া আত্মহত্যা করেন তিনি। এখন তাহার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিও কাড়িয়া নেওয়ার দাবি উঠিয়াছে। আপাদমস্তক জাতিবিদ্বেষী একজন শাসকের এমন পরিণতি হওয়াটাই কি স্বাভাবিক নহে?