করোনা ভাইরাসের আন্তর্জাতিকতা

করোনা ভাইরাসের পুরো নাম ‘করোনা কোভিড-১৯’। ভাইরাসটির জন্মস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে চীন দেশের উহান প্রদেশকে। যে চিকিত্সক সর্বপ্রথম এই ভাইরাসের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছিলেন, দেশের মানুষের কাছে প্রথমে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়নি, বরং বলা হয়েছিল এটি অপপ্রচার। অপপ্রচারের দায়ে চিকিত্সকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে চিকিত্সকের আশঙ্কা যথার্থ। কিন্তু ততদিনে সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। ভাইরাসটি তখন তার রুদ্রমূর্তি ধারণ করে ফেলেছে এবং চীন থেকে বের হয়ে শুরু করেছে বিশ্বভ্রমণ। এই মুহূর্তে বিশ্বের এমন কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে দেশ করোনা ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি।

করোনা ভাইরাসের নিষ্ঠুর আক্রমণে চীন দেশে কতসংখ্যক লোক আক্রান্ত হয়েছে এবং কত মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, তার সঠিক হিসাব নিয়ে বিশ্ব জুড়ে নানা রকমের বিতর্ক আছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, চীন করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে তথ্য গোপন করেছে, যার ফলে সমগ্র বিশ্ব আজ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কঠোর ভাষায় বলেছেন, চীনকে এর জন্য চরম খেসারত দিতে হবে। চীন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে এ কথা ঠিক, চীনে বর্তমানে যে শাসন পদ্ধতি চলছে, সেখান থেকে সঠিক তথ্য বের করে নিয়ে আসার কাজটি খুব সহজ নয়। চীনের উহান প্রদেশ থেকেই যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে, চীন তা স্বীকার করেছে, ফলে তা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটেছে। রোগটি আর চীনের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নেই, সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। রোগটির ভয়াবহ আক্রমণে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ আজ নিদারুণ আতঙ্কের মধ্যে দিন যাপন করছে। করোনা ভাইরাসের ভয়ে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জীবনের ধারা একেবারে পালটে গেছে। চিকিত্সকদের মতে, মানুষে মানুষে ব্যক্তিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এ রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়। কেননা, মানবদেহ থেকেই এ রোগের সংক্রমণ ঘটে। ব্যক্তিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে আজ রাজনৈতিক নেতাদের রাজনৈতিক সমাবেশ বন্ধ রাখতে হয়েছে, নাইট ক্লাবে গিয়ে যারা আনন্দ-ফূর্তি করে বেপরোয়া জীবন-যাপন করত, তাদের সেই লাগামহীন জীবনের ধারা বন্ধ হয়ে গেছে, মসজিদে গিয়ে যারা জামাতে নামাজ পড়তেন, মন্দিরে-গির্জায় গিয়ে যারা সমবেতভাবে উপাসনা করতেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মসজিদ-মন্দিরে নামাজ-উপাসনা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, অফিস-আদালত, কল-কারখানা, বাজারঘাট, প্লেন-ট্রেনসহ সব রকমের পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ মানুষের জীবনের যাবতীয় কার্যক্রম আজ স্তব্ধ হয়ে গেছে। বলা যেতে পারে, করোনার ভয়ে সমস্ত বিশ্ব আজ থমকে গেছে, চমকে গেছে। বিশ্বের মানুষ আজ দিশেহারা।

কালে কালে, যুগে যুগে বিশ্বের মানুষ অনেক রোগ দেখেছে; যেমন—কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা, প্লেগ, ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়া, ফ্লু, ডেঙ্গু ইত্যাদি। কিন্তু এসব রোগ এতটা আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করতে পারেনি, যেমনটি করোনা পেরেছে। বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরে এমন একটি লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে লোকটি করোনা নামের রোগের কথা জানে না। শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষ চোখ বন্ধ করে করোনা ভাইরাসের নাম উচ্চারণ করতে পারবে। কাজেই ‘করোনা’ শব্দটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি প্রায় তুলনাবিহীন। করোনা শব্দটির কোনো বিকল্প শব্দ নিয়ে বিশ্বের কেউ ভাবেনি। এটি কোন দেশের কোন ভাষার শব্দ, তা নিয়েও কারো মাথাব্যথা নেই। বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষ ‘করোনা’ শব্দটি বিনা প্রতিবাদে, বিনা বাক্যব্যয়ে গ্রহণ করেছে। কাজেই বলা যেতে পারে, ‘করোনা’র মতো আন্তর্জাতিক মানের দ্বিতীয় কোন শব্দ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

করোনা ভাইরাসের জন্ম যেহেতু একটি সমাজতান্ত্রিক দেশে, ভাইরাসটির মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চরিত্র দৃশ্যমান। সমাজতন্ত্রের বাংলা একটি বিকল্প শব্দ আছে ‘সাম্যবাদ’। ‘করোনা’ ভাইরাসের মধ্যে যে সাম্যবাদী চেতনা রয়েছে, এর কোনো তুলনা হয় না। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উচ্চবিত্ত- নিম্নবিত্ত, ধার্মিক-অধার্মিক, নাস্তিক-অনাস্তিক, গ্রাম-শহর, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-ইহুদি, মন্দির, মসজিদ, গির্জা, ভদ্র-শূদ্র, মূর্খ, পণ্ডিত, কারখানার মালিক-শ্রমিক, কৃষিজীবী-বুদ্ধিজীবীর মধ্যে করোনা ভাইরাস কোনো রকম ভেদরেখা টানেনি। সমাজের সর্বস্তরে করোনার নির্বিঘ্ন পদচারণা। করোনা ভাইরাসের দৃষ্টিতে বিশ্বের সব স্তরের সব মানুষ সমান, যে কাউকে স্পর্শ করতে করোনা ভাইরাসের কোনো রকমের দ্বিধা নেই, পক্ষপাতিত্ব নেই। এমন সাম্যবাদী চরিত্রের ভাইরাস পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না।

করোনা ভাইরাসের আকৃতি এতই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে তাকে দেখার উপায় নেই। অতি শক্তিশালী যন্ত্রের দ্বারা তার অস্তিত্ব খুঁজে পেতে হয়। যখন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তার আকৃতি একটি সুন্দর কদম ফুলের মতো দেখা যায়। এত ক্ষুদ্র আকৃতির একটি ভাইরাসের কাছে পৃথিবীর খ্যাতিমান চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা ধরাশায়ী, দিশেহারা। অথচ চিকিত্সাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা দেখে অনেকে মনে করেছিলেন মানুষের মৃত্যুঞ্জয়ী হতে আর বেশি সময় লাগবে না। মানুষ স্থল, জল, আকাশ-পাতালকে জয় করেছে, অল্প সময়ের মধ্যে সে মৃত্যুকেও জয় করে ফেলবে। কিন্তু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করোনা ভাইরাসের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুকে জয় করার স্বপ্ন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। করোনার মহাপ্রলয়ে পৃথিবী এখন লন্ডভন্ড। করোনার নিষ্ঠুর থাবায় বিশ্বে ৪ লাখের বেশি মানুষের জীবন নিভে গেছে, প্রায় ৮০ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। পৃথিবী এমন মহামারি ও মর্মান্তিক মৃত্যু আগে কখনো দেখেনি। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব—এ কথা যেমন সত্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মানুষের অর্জনকেও ছোটো করে দেখা যায় না। কিন্তু সেই অর্জনকে নিয়ে মানুষ যখন হিংস্রতা ও যুদ্ধবিগ্রহে মেতে ওঠে, দম্ভ ও অহংকারে মানুষ মত্ত হয়ে যায়, বিধাতার চেয়েও নিজেকে বেশি শক্তিধর মনে করে, এটি সীমালঙ্ঘন ছাড়া আর কিছু নয়। দাম্ভিক, অহংকারী ও সীমা লঙ্ঘনকারীদের বিধাতা মোটেই পছন্দ করেন না। পবিত্র কোরআনসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থেও তেমন কথা বলা আছে। করোনা অহংকারীদের অহংকার, দাম্ভিকদের দম্ভ ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।

পৃথিবীর বৃহত্ শক্তিধর দেশের নেতাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ ও মারণাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা বিশ্ববাসী দেখেছে। অতি আধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে মানুষ হত্যা করা যায়, কিন্তু অতি ক্ষুদ্রাকৃতির করোনাকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা আধুনিক মারণাস্ত্রের নেই, এটি এখন পরীক্ষিত সত্য। করোনার কাছে মহাশক্তিধর নেতারা অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা দিনে দিনে শোচনীয় হয়ে পড়ছে, মারণাস্ত্র তৈরির ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে, যুদ্ধের প্রবণতা কমছে। করোনার আক্রমণে সবাই এত বিধ্বস্ত হয়ে গেছে যে যুদ্ধবাজ দেশগুলো যুদ্ধের কথা প্রায় ভুলেই গেছে। করোনার মৃত্যুহারের চেয়ে যুদ্ধের মৃত্যুহার ছিল অনেক বেশি। যুদ্ধের জন্য মানুষকে দেশত্যাগ করতে হয়েছে, করোনার সঙ্গে যুদ্ধের চিত্র অন্যরকম, বরং করোনার কারণে মানুষকে নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে হচ্ছে। করোনার আক্রমণ মোকাবিলা করতে গিয়ে যুদ্ধবাজ বৃহত্ শক্তিধর দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয়, মারণাস্ত্র তৈরি না করে করোনার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য প্রতিষেধক অষুধ তৈরির কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে, সেটাই হবে বিশ্বের জন্য কল্যাণকর।

বিশ্বের সভ্য দেশ বলে যারা দাবি করে, তাদের দেশের নৈশ ক্লাবগুলোতে অশ্লীলতা ও যৌন স্বেচ্ছাচারিতার যে সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল, করোনা সেই অপসংস্কৃতিকে প্রায় রুদ্ধ করে দিয়েছে। মৃত্যু প্রতিটি মানুষের জন্য অবধারিত, কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হয়ে দুর্বিষহ মৃত্যু কারো কাম্য হতে পারে না। যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন, স্রষ্টার প্রতি যারা আস্থাশীল, তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, বিশ্বের যিনি স্রষ্টা, তিনিই বিশ্বপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। প্রাকৃতিক নিয়মে কোনো রকম অসংগতি নেই। বিশ্ববিধাতার বিধান অনুসারেই প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে। মানুষ যদি এঁদো পুকুর তৈরি করে রাখে, প্রাকৃতিক নিয়মে সেখানে মশার জন্ম হবে, মশার কামড়ে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হবে, সেটাই স্বাভাবিক। গোবর জমা করে রাখলে সেখানে গোবরে পোকার জন্ম হবে, এটি বিধাতার বিধান। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলাই যায়, চীনের উহানে এমন কিছু অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল, যেখানে করোনা ভাইরাসের জন্ম হয়েছে। কাজেই করোনা ভাইরাসের জন্য চীনকে দায়দায়িত্ব নিতেই হবে। পবিত্র কোরআন শরিফে আল্লাহ বারবার মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কোনো জাতিকেই তিনি ধ্বংস করেন না, কোনো জাতি যদি ধ্বংস হয়, ধ্বংসের জন্য আল্লাহ সেই জাতিকেই দায়ী করে থাকেন।

তবে একথা বলা যায়, ‘করোনা’ একটি আন্তর্জাতিক শব্দ, করোনা একটি আন্তর্জাতিক ব্যাধি। এটি কোনো আঞ্চলিক ব্যাধি নয়। আন্তর্জাতিকভাবেই করোনাকে মোকাবিলা করতে হবে। আমরা আশাবাদী। অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের খ্যাতনামা চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবীকে ও বিপদগ্রস্ত মানব জাতিকে নিষ্ঠুর করোনা ভাইরাসের ছোঁবল থেকে মুক্ত করতে সমর্থ হবেন ইনশাআল্লাহ।

n লেখক :সাবেক ভিসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়