সীমান্ত নিয়ে ভারত ও চীন সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বাজে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। ভারতের লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে (এলএসি) পাহারা দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান শক্ত আচরণ সীমান্ত এলাকায় একটি নতুন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বহু বছর ধরে দুই দেশের গোটা সীমান্ত নিয়ে বিতর্কের কারণে এলএসি দেশ দুটিকে ভাগ করেছে। সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহে ভারত ও চীনের সেনারা লাইন অব কন্ট্রোলের অনির্ধারিত স্থানগুলোতে অন্তত চারটি সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। এ সব ঘটনা সাধারণত গরমের মাসগুলোতে ঘটে থাকে। এ সময়ে দুই দেশের সেনারা নিজেদের এলাকার ধারণা অনুসারে সচরাচর পাহারায় নেমে আসে। এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পুরো দায়িত্ব বাহিনীর ওপর। মিলিতভাবে সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা ২০০৫ সালের প্রটোকলে বলা আছে, কোনো পক্ষ মুক্ত প্রয়োগ করতে পারবে না অথবা শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিতে পারবে না। দুই পক্ষকেই একে অপরের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করতে হবে এবং কোনোক্রমে কোনো উসকানিমূলক আচরণ করা যাবে না। ২০১৩ সালে সীমান্ত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে বলা হয়েছে, একের টহলকে আরেক পক্ষ অনুসরণ করতে পারবে না এবং লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ-সমঝোতার বিষয় নেই, এমন ক্ষেত্রে এক পক্ষ আরেক পক্ষের পেছনে গিয়ে টহল দিতে পারবে না। দুই পক্ষের উদ্দেশ্যেই বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করতে হবে এবং কোনো ধরনের উসকানিমূলক আচরণ এবং মুখোমুখি হলে শক্তি প্রয়োগের ভয় দেখানো যাবে না।
ভারত সীমান্তে তার অবকাঠামো উন্নয়ন করতে শুরু করেছে। সে কারণে সীমান্তের আরো ভেতরের দিকে টহল দিতে শুরু করেছে, যেই অঞ্চলে এত দিন চীন বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল এবং সচরাচর তাদের উপস্থিতি ছিল। এই কারণেই চীন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
২০২২ সালের মধ্যে অরুণাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, সিকিম, উত্তরাখণ্ড এবং হিমাচল প্রদেশসহ ৬১টি কৌশলগত সীমান্ত সড়কের কাজ সম্পূর্ণ করবে ভারত। এতে ৩ হাজার ৪১৭ কিলোমিটার সড়ক যোগ হবে। ২০০৮ সালে ভারত লাদাখের প্রধান বিমানঘাঁটি লেহ-র ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দৌলত বেগ ওদলি এবং ফকুচে-তে পুনরায় বিমানঘাঁটি চালু করেছে। ২০০৯ সালে নিয়মা এয়ারফিল্ড পুনরায় চালু করা হয়েছে। চীন যে ঐ অঞ্চলের ভূখণ্ডে কৌশলগত সুবিধা ভোগ করছে, তার একটা ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে ভারত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিমানঘাঁটি তৈরির মাধ্যমে। ফলে পিপলস লিবারেশন আর্মির গাত্রদাহ হয়েছে। দুই পক্ষই এখন সামনে আগানোর পলিসি গ্রহণ করেছে এবং দুই পক্ষই মনে করছে এটা তাদের অধিকার। যে কারণে আজ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে উহানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে আলোচনার পর চীন চেয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ রক্ষায় একটি সমঝোতায় আসতে। এর কারণ হলো, চীন চেয়েছিল তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে আন্তর্জাতিক সমর্থনকে সম্প্রসারিত করতে। বেইজিং মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইন্দো প্যাসিফিক কৌশলে ভারত ঝুঁকে পড়েছে এবং সে কারণে চীন তার কৌশলের সঙ্গে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। চীনের মূল উদ্দেশ্য হলো ভারত যেন গিলগিট-বাল্টিস্তান উদ্ধার করে অখণ্ড কাশ্মীর তৈরি করতে না পারে। চীন নিজেও আকসাই চীন ধরে রাখার ব্যাপারে সোচ্চার। আকসাই চীন তিব্বত এবং ঝিংজিয়ানের মাঝে সংযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর গড়ে তোলার পেছনে চীন ইতিমধ্যে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই করিডরের মধ্যে গিলগিট বাল্টিস্তানও রয়েছে। চীনের ধারণা, গিলগিট বাল্টিস্তানে ভারত হস্তক্ষেপ করলে তা ইকোনমিক করিডরের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করবে। চীনের প্রেসিডেন্ট এই প্রকল্পকে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি মনে করেন, এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে পাকিস্তানের গধর বন্দর দিয়ে চীনের সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশ ঘটবে। ভারত চীনের এই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারত মনে করে, চীন পাকিস্তান ইকোনমিক কোরিডর ভারতের দাবিকৃত গিলগিট বাল্টিস্তানের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, যা ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত।
গত বছর ভারত অর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখকে ইউনিয়ন টেরিটরি করার পর মনে হচ্ছে চীন তার কৌশল পরিবর্তন করেছে। ভারত সব সময় আকসাই চীনের ওপর দাবি রেখে আসছে। কিন্তু জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আকসাই নিয়ে চীনের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু ভারত এ ব্যাপারে আপস করবে না।
সীমান্তে উদ্যত আচরণের পর চীন আরো অমর্যাদা যুক্ত করেছে। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার যে দাবি ভারত করে আসছে সে ব্যাপারে চীন কোনো কর্ণপাতই করেনি। কোভিড শুরু হওয়ার আগে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৫১.৬৮ বিলিয়ন ডলার। মোদি সরকার সীমান্ত অবকাঠামো তৈরি নিয়ে চীনের কোনো চাপ অনুভব করবে না। কারণ, ভারত এই কাঠামো তৈরি করছে নিজের বৈধ ভূখণ্ডের মধ্যেই।
(ইংরেজি থেকে অনূদিত)
n লেখক :দৈনিক ইত্তেফাকের দিল্লি প্রতিনিধি