করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে এসব প্যাকেজের বাস্তবায়ন তদারকির জন্য মনিটরিং সেল ও কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণ শুরু করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে নির্দেশনাও জারি করেছে। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ হবে করোনাকালে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে তার সুবিধা পৌঁছানো। কৃষক, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতাভুক্ত বড়ো একটি অংশ। তাদের অধিকাংশের বসবাস প্রান্তিক পর্যায়ে, যাদের সঙ্গে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ সচরাচর হয় না।
তৃণমূলে প্রণোদনা প্যাকেজ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা হলো, সরকারের কাছে করোনায় অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কোনো ডাটাবেজ নেই। সরকার শুধু অতিদরিদ্র বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীর সংখ্যা জানে, যাদেরকে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা দেওয়া হয়। করোনা আমাদের দেখিয়েছে যে, বড়ো ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ে শুধু অতিদরিদ্র কর্মহীন মানুষই না খেয়ে থাকে না, বরং তৃণমূলের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত অনেকেই খাবারের অভাবে নিভৃতে কাঁদে। সুতরাং এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও আর্থিক সক্ষমতা বিষয়ক ডাটাবেজ। শুধু দশ বছর অন্তর আদমশুমারি নয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে এর মধ্য মেয়াদে মানুষের আর্থিক অবস্থা সংক্রান্ত শুমারিও পরিচালনা করতে হবে, যেন নব্য দরিদ্র এবং বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে নিম্ন মধ্যবিত্তরাও সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে।
তৃণমূলে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ প্রদান পদ্ধতি কেমন হবে সেটি সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। কেননা রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন সহজ হলেও তৃণমূলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভিন্নধর্মী কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ত্রাণ বিতরণে যে ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, প্রণোদনার ক্ষেত্রে সেটির যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। দেশের সকল উপজেলায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়েও অধিকাংশ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা নেই। কিছু উপজেলায় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকই একমাত্র ভরসা। সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে উপজেলার যাবতীয় সরকারি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। ব্যাংকটির স্বল্প জনবলের বিপরীতে ব্যাপক সেবা পরিধির জন্য নতুন করে তৃণমূলে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের গুরু দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হবে বড়ো ধরনের চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তা সাধারণত ব্যাংকের গ্রাহক নয়। ব্যাংকের সেবা বা ঋণ গ্রহণে তারা অভ্যস্তও নয়। এজন্য তৃণমূলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে ঋণ বিতরণে কাজে লাগাতে হবে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতি। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোকে নতুন গ্রাহক সৃষ্টি করতে হবে। ব্যাংকে হিসাব খোলার এবং প্রণোদনা প্যাকেজের গ্রাহক হওয়ার শর্তাবলি ও পদ্ধতি সহজ করতে হবে। কারণ অনেক ক্ষতিগ্রস্তেরই ব্যাংকের হিসাব নাই। শুধু নির্দিষ্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট না থাকায় কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ব্যাংক থেকে যেন ফিরে না যায়, তার সমাধান বের করা জরুরি। উপজেলা পর্যায়ের ডাকঘরে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ প্রদানের উইং খুলতে হবে। গ্রামের মানুষের সঞ্চয়ের আস্থার বাতিঘর ডাকঘরের সঞ্চয় ব্যাংককে এক্ষেত্রে সাব-ব্যাংকিং ইউনিট হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
ঢাকা